ডিজিটাল থেকে সাইবার – শুধু বোতলের নাম বদল, বিষ একই
যে দেশে আইনের নাম শুনলেই মানুষের গায়ে কাঁটা দেয়, সেখানে আইন বদলানো মানে কি সত্যিই স্বস্তির নিঃশ্বাস, নাকি নতুন করে ভয়ের প্যাকেটিং? ২০১৮ সাল থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আমাদের ওপর এমন এক অদৃশ্য জেলখানা ঝুলিয়ে রেখেছিল, যেখানে একটা ফেসবুক পোস্ট, একটা কার্টুন, একটা প্রতিবেদন, এমনকি কারও ক্ষুধার আর্তনাদ শেয়ার করাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। বছরের পর বছর সাংবাদিক, লেখক, ছাত্র, কর্মী, ব্লগার, শত শত মানুষকে এই আইনের বিধান দেখিয়ে কোর্ট থানা জেলখানার দৌড়ে ক্লান্ত করে ফেলা হল। তারপর হঠাৎ একদিন সরকার বলল, “মানুষের উদ্বেগের কথা ভেবে” ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাকি তুলে নেওয়া হবে, তার বদলে আসবে “সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট”, নতুন যুগের উপযোগী, আধুনিক, সংস্কার করা আইন। কাগজে দেখলে মনে হয়, বিশাল পরিবর্তন, আইনের নাম পাল্টেছে, কিছু ধারার সাজা কমেছে, কিছু জায়গায় জামিনের সুযোগ এসেছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, বোতলের গায়ের লেবেলটা শুধু বদলানো হয়েছে, ভেতরের বিষ ঠিকই একই রয়ে গেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যবহারটা ছিল মতপ্রকাশ ঠেকাতে, বিশেষ করে ধর্ম, রাষ্ট্র, “জাতীয় ভাবমূর্তি”, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” ইত্যাদির সমালোচনা থামাতে। “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”, “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা”, “ভুয়া তথ্য” এইসব অস্পষ্ট শব্দ দিয়ে যে কারও বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া যেত, পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই ধরে নিয়ে যেতে পারত, মাসের পর মাস হাজতে রেখে তদন্ত করত, আর এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটাই হয়ে উঠত শাস্তি। এখন সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে এসে কি এই ছবিটা বদলেছে? নাম বদলেছে, সাজা কিছু কমেছে, এক আধ জায়গায় জামিনের সুবিধা যোগ হয়েছে, কিন্তু একই ধরনের অপরাধের সংজ্ঞা, একই ভাঙাচোরা ভাষায় “ধর্মীয় মূল্যবোধ”, “রাষ্ট্রের নিরাপত্তা”, “উস্কানি”, “মানহানি” রেখে দেওয়া হয়েছে। আগে যে ৭ বছর জেল হত, এখন ৫ বছর আগের আগুন এখন একটু কম জ্বলা আগুন। প্রশ্ন হল, আগুনের অস্তিত্বই কি মেনে নেওয়া হবে, না আমরা দাবি করব, এটা পুরোই অন্যায়?
সবচেয়ে বেশি ধোঁকা লুকিয়ে আছে “ধর্মীয় অনুভূতি” নামের সেই পুরনো ভূতের ভেতরে। এই ধারাটা মূলত রাষ্ট্রের হাতে এক স্বর্গীয় অস্ত্র, যার আড়ালে ধর্মীয় চেতনার নাম করে যে কোনো যুক্তিবাদী লেখা, নাস্তিকতা, নারীবাদ, এলজিবিটি অধিকার, সংখ্যালঘুদের নিয়ে সমালোচনাকে অপরাধ বানানো যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অসংখ্য ব্লগার লেখক গ্রেপ্তার হয়েছে কেউ “ধর্মনিন্দা”, কেউ “প্রবচন বিকৃতি”, কেউ বা কার্টুন আঁকার অপরাধে। কতজনকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে, কতজন গুম খুনের শিকার হয়েছে, কতজনের জীবন থমকে আছে, এসবের কোনো সুষ্ঠু হিসাব পাওয়া যায় না। নতুন সাইবার আইন এসে এই ধারাগুলোর ভাষায় সামান্য কসমেটিক বদল এনে রেখেছে, কিন্তু মূল বক্তব্য একই, ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করলে আইনের মার পড়বে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র বলছে, “আগেও তোমার মুখ বন্ধ করার জন্য আইন ছিল, এখনও আছে, শুধু নাম আলাদা।”
একজন নাস্তিক, উভকামী নারী হিসেবে এই ধারাগুলোর হিংস্রতা শরীরের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছায়। ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা, পিতৃতন্ত্র নিয়ে কথা বলা, কোরআন হাদিস ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মৌলবাদের সমালোচনা করা, এসব আমার রাজনৈতিক অস্তিত্বের মূল। সেই অস্তিত্বের ওপরই এই আইন এমনভাবে ঝুলে আছে, যেন আমি যে কোনো দিন যে কোনো পোস্টে “অপরাধী” হতে পারি। এলজিবিটি অধিকার নিয়ে লিখলে, কেউ খুব সহজেই বলতে পারে, “এটা ধর্মবিরোধী, সমাজবিরোধী, নৈতিকতাবিরোধী”, এবং সেই অভিযোগই যথেষ্ট, কোনো কট্টর আলেম বা ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর ক্রোধ লাগলে মামলা ঠুকতে বিশেষ কষ্ট হয় না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে আগে যা হচ্ছিল, এখন সাইবার সিকিউরিটির নামে একই কাজ করার রাস্তা খোলা রাখা মানে নতুন ব্র্যান্ডিং এর নিচে পুরনো রক্তমাখা স্ক্রুড্রাইভার ঢেকে রাখা।
অনেকে বলতে চায়, “আগের তুলনায় তো আইনটা কিছুটা নরম হয়েছে”, এই যুক্তিটা নিজেই এক ধরনের ফাঁদ। আগে যেটা স্পষ্ট দমন ছিল, এখন সেটা “সংস্কার” এর ভাষায় ধোঁয়াটে হয়েও টিকে আছে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সরকার নাম পাল্টেছে, কয়েকটা মোটা ধারার সাজা কমিয়েছে, কিন্তু যে ধারাগুলোর অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের কাঠামো অক্ষত। এভাবে আইন সাজিয়ে রাষ্ট্র দুই দিকেই খুশি রাখতে চায়: একদিকে বলে, “দেখুন, আমরা রিফর্ম করেছি” অন্যদিকে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে নিশ্চিন্ত বার্তা দেয়, “ধর্মনিন্দা ঠেকানোর বন্দোবস্ত অক্ষুণ্ণ আছে।” ফল যা দাঁড়ায়, তা হল আগের মতোই আত্ম সেন্সরশিপ। ব্লগার, সাংবাদিক, কর্মী, সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারী, সবার মাথার ওপর এক অদৃশ্য কাঁচের ছাদ, যার ওপরে উঠলে যে কোনো নামের যে কোনো আইনে মাথা ফেটে যাবে।
এখানে নারীর, বিশেষ করে প্রান্তিক নারীর ভয়টা আরেকভাবে কাজ করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যারা নারী হিসেবে, কুইয়ার হিসেবে, ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করতে চায়, তাদের জন্য এই সব সাইবার আইন দ্বিমুখী হিংসা তৈরি করে। একদিকে অনলাইন হয়রানি, ধর্ষণের হুমকি, ব্যক্তিগত ছবির অপব্যবহার, গালিগালাজ অন্যদিকে যখন তারা ন্যায়বিচার চেয়ে, থানা কোর্টে নাগরিক হিসেবে দাঁড়াতে যায়, তখন সামান্য এক চাপেই তাদের বক্তব্যকে “ধর্মবিদ্বেষী”, “রাষ্ট্রবিরোধী” বানিয়ে দেওয়া যায়। অর্থাৎ, যে আইন দাবী করছিল “সাইবার অপরাধ দমন” করবে, সেটাই বাস্তবে হয়ে ওঠে কণ্ঠ দমন এর নতুন প্রহরী।
আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল মহলের অনেকেই এই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে চুপ কেউ বলে “আগের চেয়ে তো একটু ভালো”, কেউ বলে “দেখা যাক, বাস্তবে কতটা অপব্যবহার হয়।” কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সময় আমরা দেখেছি, যে ধারার অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেটা শেষ পর্যন্ত নিশ্চয়ই অপব্যবহার হয় কারণ ক্ষমতা সবসময় নিজের পরিসর বাড়াতে চায়, কমাতে চায় না। নাম পাল্টানো, সাজা ২ বছর কমানো, জামিনের শর্ত খানিক নরম করা, এসব আসলে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়ার কূটনৈতিক স্ক্রিপ্ট। ভেতরের দেশে, বিশেষ করে থানার ডিউটি অফিসারের চোখে, স্থানীয় শাসকদলের নেতার চেহারায়, মৌলবি মোল্লার ফতোয়ার ভাষায় কিন্তু কিছুই বদলায় না।
ডিজিটাল থেকে সাইবার, এই নাম বদলের বেড়াজাল ভাঙতে হলে আমাদের কথার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে অভিজ্ঞতাকে। কত সাংবাদিক এখনও মামলা হামলার ভয়ে নিজের রিপোর্ট হালকা করে লেখে, কত ব্লগার নিজের পুরনো লেখা ডিলিট করেছে, কত তরুণ তরুণী ইনবক্সে কথা বলে, পাবলিক পোস্টে নয়, এসবই এই আইনের প্রকৃত প্রভাব। বোতলের রং, লেবেল, ব্র্যান্ডিং নিয়ে যতই খেলা হোক, বিষ যদি একই থাকে, তাহলে আমাদের শরীরে পোড়া দাগও একই থাকবে, শ্বাস বন্ধ হওয়ার অনুভূতিও একই থাকবে।
তাই, আগস্ট ২০২৩ এর এই নাম বদল কাণ্ডকে “সংস্কার” বলে হাততালি দেওয়ার বদলে, বরং সৎভাবে বলা দরকার, এটা মানুষের কণ্ঠের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার আরেক কৌশল মাত্র। যে দিন সত্যিকারের মুক্তির আইন আসবে, সেদিন ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করা, রাষ্ট্রের সমালোচনা করা, যৌনতা জেন্ডার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খোলাখুলি লেখা, এসব আর অপরাধ থাকবে না। ততদিন পর্যন্ত আইন যাই নামে ডাকুক নিজেকে, আমাদের ডায়েরি, টাইমলাইন, ব্লগ আর গলার ভেতরে একটাই কথা ঘুরে বেড়াবে, বোতল একই, বিষ একই, কেবল আমাদের সহ্যশক্তিকেই নীচে থেকে একটু একটু করে কেটে ফেলা হচ্ছে।