Fri, Feb 27, 2026

মুক্ত চিন্তা কি শুধুই স্লোগান?

মুক্ত চিন্তা কি শুধুই স্লোগান?
  • PublishedFebruary 20, 2023

একুশের বইমেলা, শব্দটা শুনলেই বুকের মধ্যে একটা আলাদা কম্পন জেগে ওঠে। ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় যে সাদা তাঁবুগুলো দেখতাম, বইয়ের পৃষ্ঠা ওলটাতে থাকা মুখগুলো, কবি লেখকদের গম্ভীর মুখ আর তরুণদের হাতে বই, সবকিছুর মধ্যে ছিল একরকম পবিত্রতা, যেন এই মেলাই আমাদের মগজের মুক্তির মঞ্চ। সেই পবিত্রতার শরীরে আজ শৃঙ্খল ঝুলছে, লোহার শিকল এর মতো ভারী, ঠান্ডা আর অপমানজনক।
যখন জানতে পারলাম আদর্শ প্রকাশনীকে বইমেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তখন রাগ এলেও রাগের চেয়ে লজ্জাই বেশি লাগছিল। মুক্তচিন্তা, যে শব্দটা আমাদের রাষ্ট্র প্রতিদিন গর্ব করে উচ্চারণ করে, সেই শব্দই আজ সরকারের নিজস্ব ভয়ে পরাজিত। যুক্তিবাদ, প্রশ্ন, প্রতিবাদ, এগুলো যেন এখন নিষিদ্ধ বস্তু। ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, এই বাক্যটা আজ রাষ্ট্রের হাতে এমন এক জাদুর শব্দ, যার আড়ালে যে কোনো সত্যিকে নির্বাসিত করা যায়, যে কোনো লেখককে অপরাধী বানানো যায়।
বইমেলাকে আমি অনেকদিন ধরেই একটা মানসিক আশ্রয় ভেবেছি। বিদেশে থাকলেও প্রতি ফেব্রুয়ারিতে মনে পড়ে যায় সেই ভিড়, ধুলোমাখা পা, তারপর এক কাপ চা হাতে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বই নিয়ে তর্ক। কিন্তু এখন যখন দেখি, ‘আঘাতপ্রাপ্ত ধর্মীয় অনুভূতি’-র নামে একের পর এক কণ্ঠ বন্ধ হচ্ছে, তখন মনে হয় এই মেলাটা এখন আমাদের নয়, এটা একদল ভীতু আমলা আর শক্তিশালী ধর্মব্যবসায়ীর। তারা নির্ধারণ করবে কোন বই মানুষ পড়বে, কোন লেখক মঞ্চে উঠবে, আর কোন চিন্তা ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠেছে।
আমি জানি, এই কথাগুলো এখন বাংলাদেশে বলা মানে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা। কিন্তু এই নীরবতাই তো তাদের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র। যতদিন আমরা চুপ থাকব, তারা নিখুঁতভাবে আমাদের শ্বাসরোধ করবে। মনে পড়ে আমার এক বন্ধু, ঢাকায় এক মফস্বল কলেজে পড়ায়, বলেছিল: “আমরা এখন এমন, মাঝরাতে কেউ দরজায় ঠক ঠক করলে মনে হয় পুলিশ না মৌলবাদী কে জানি!”, এই ভয়টাই রাষ্ট্র এখন স্বাভাবিক করে ফেলেছে। বই নিষিদ্ধ করা তো তারই নরম মুখ।
আদর্শ প্রকাশনী শুধু নিষিদ্ধ হয়নি তাদের বইগুলোকেও গালাগালি করা হয়েছে “রাষ্ট্রবিরোধী”, “ধর্মবিরোধী” ট্যাগ দিয়ে। অথচ প্রশ্ন করি, রাষ্ট্রবিরোধী মানে কী? যদি রাষ্ট্র অন্যায় করে, মানুষ যদি তার বিরুদ্ধে লেখে, তাহলে কি সেটাই রাষ্ট্রবিরোধিতা? আর ধর্মবিরোধী বললেই তো আরও মজার এক দুনিয়া খুলে যায়, এই ‘ধর্মের’ সংজ্ঞা কে দেবে? ইমাম? মন্ত্রী? নাকি সেন্সর বোর্ডের কোনও কর্মকর্তা? যদি সমালোচনাই ধর্মবিরোধী হয়, তাহলে ধর্মের নিরাপত্তা কিসে?
কখনও কখনও নিজের অভিজ্ঞতার কথাও ভাবি। আমি নারী, আমি উভকামী, আমি নাস্তিক, আমার অস্তিত্বই যেন বাংলাদেশে একধরনের বইমেলার নিষিদ্ধ স্টল। আমার নিজের পরিবার একসময় চায়নি আমি ধর্ম ছেড়ে এমন প্রকাশ্যে ‘অবিশ্বাসী’ পরিচয় দিই। বন্ধুরা বলেছে, “তুমি বিদেশে থাকো, তোমার কথা বলা সহজ।” কিন্তু আমি জানি, এ কথা বলা সহজ নয়। নিজের মাটির প্রতি ভালোবাসা যতটা গভীর, তার ব্যথাও ততটা গভীর। যখন ঢাকায় কারও মুখে শুনি, “ওই নাস্তিক মেয়েটা এখন লন্ডনে নিরাপদে বই পড়ছে”, তখন মনে হয়, নিরাপত্তা নয়, নির্বাসনেই আছি।
আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা একটা পোশাকি শব্দ, যেন অনুষ্ঠানের ব্যানারে ঝুলছে, বাস্তব জীবনে তার স্থান নেই। টেলিভিশনে উপস্থাপক বলবে, “আমরা মুক্তচিন্তার চর্চা চাই”, আর পরের স্ক্রিনে দেখানো হবে এক তরুণ ব্লগারের লাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলবে, “ধর্মের কোনো বিরোধিতা নয়, কেবল গঠনমূলক আলোচনা চাই”, অথচ ধর্ম নিয়ে সত্যিকার প্রশ্ন তোলামাত্র চাকরি চলে যায়। এই ‘গঠনমূলক’ কথার আড়ালে আছে আত্মসমর্পণ।
আমি বিশ্বাস করি, চিন্তার কোনো জাতীয় সীমানা নেই। যুক্তি, প্রশ্ন, বিদ্রোহ, এগুলোই মানুষকে মানুষ করে তোলে। বইমেলা যদি সত্যিই ভাষা শহিদদের স্মৃতিতে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই রাষ্ট্রীয় সেন্সর ভাঙা। কারণ শেখ মুজিবের ভাষণ থেকে শুরু করে হুমায়ুন আজাদের বই, সবই প্রশ্নের সন্তান, অন্ধ আনুগত্যের নয়। বইমেলা মানে তো ‘মেলবন্ধন’, সেখানে যদি ভাবনা আর বিশ্বাস আলাদা ঘরে বন্দি থাকে, তবে এই মেলা কেবল নামেই স্বাধীন।
ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা করার কথা বলে যারা যুক্তির বই পুড়িয়ে দেয়, তারা জানে না, এই পুড়িয়ে দেওয়া বইয়ের ছাই থেকেই নতুন কণ্ঠ গজাবে। একটি আদর্শ যদি আজ নিষিদ্ধ হয়, আগামী বছর পঁচিশটি নতুন প্রকাশনা সেটি পুনরায় ছাপবে। কারণ শব্দের মৃত্যু হয় না। রাষ্ট্র যতবার সেন্সর বসায়, ততবার সে নিজের ভয়টাকেই প্রকাশ করে।
আজ বইমেলায় যে শিকল পড়েছে, তা আমাদের কণ্ঠের ওপরেও নেমে এসেছে। কিন্তু তবুও লিখব। লিখব, কারণ নীরবতা মানে পরাজয়। লিখব, কারণ যিনি নিজের ভাষার জন্য মরতে পারেন, তিনি নিজের কথার জন্যও দাঁড়াতে জানেন। বইমেলা কোনও ধর্মীয় মঞ্চ নয়, কোনও সরকারি প্রোপাগান্ডার প্রদর্শনীও নয়, এটা চিন্তার মেলা, মানুষের মেলা। সেখানে শিকল মানায় না।
যেদিন বাংলাদেশ এই সহজ সত্যটা বুঝবে, সেদিনই বইমেলা সত্যিকারের মুক্তির উৎসব হয়ে উঠবে, শুধু পাতা নয়, চিন্তাও ওলটাবে।