বাউল আবুল সরকারের গলা টিপে কি সত্যিই আল্লাহকে রক্ষা করা যায়?
৪ নভেম্বর, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ঝাবড়া এলাকার খালা পাগলী মেলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাউল শিল্পী আবুল সরকার, যার নামের আগে অনেকে স্নেহভরে ‘মহারাজ’ যোগ করে, সুর আর কথার ভেতর দিয়ে আল্লাহ, সৃষ্টিতত্ত্ব আর মৌলবাদীদের নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। পালাগানের সেই রাতের পুরো ভিডিও এখনো কেউ ঠিকমতো দেখেনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দু একটা কাটা ক্লিপ যেখানে শুনতে পাওয়া যায়, তিনি আল্লাহর সৃষ্টির ক্রম নিয়ে মজার ছলে এক প্রতিদ্বন্দ্বী বাউলকে প্রশ্ন করছেন, আর কোথাও কোথাও মৌলবাদীদের ভণ্ডামি নিয়ে টীকা টিপ্পনী করছেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই রাতের সুরের জায়গা দখল করে নিল অন্য এক শব্দ “ব্লাসফেমি”, “ধর্ম অবমাননা”, “তৌহিদি জনতা’র ক্ষোভ” আর ২০ নভেম্বর রাতে মাদারীপুরের আরেকটি গানের আসর থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে মানিকগঞ্জে নিয়ে গেল।
পরের দিন, ঘিওর থানার ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ একটি মামলা করলেন দণ্ডবিধির ১৫৩, ২৯৫এ, ২৯৮ ধারায় অভিযোগ: আবুল সরকার নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে অপমান করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, উত্তেজনা সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতে চেয়েছেন। এই সব ধারার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরের কম, কিন্তু ভাষা এমনভাবে সাজানো, যেন পুরো দেশ তার কথায় কেঁপে উঠেছে যেন সুরের ভেতর লুকানো দু একটি প্রশ্নই সমাজে অগ্নিসংযোগের সমান অপরাধ। তাকে দ্রুত আদালতে তোলা হলো, জামিন না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হলো, আর সেই সময়ে মানিকগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে ‘আলেম উলামা ও তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে এক মানববন্ধন মিছিল চলল, মাইকে গর্জে উঠল, “কঠোর শাস্তি চাই”, “ধর্মের শত্রুদের ফাঁসি চাই।”
এই দৃশ্যটার সঙ্গে আমার অনেক পরিচিত স্মৃতি মিশে যায় রিতা দেওয়ানের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, শরিয়ত বয়াতির মামলা, লালনের মাজার ঘিরে চিৎকার সব জায়গায় একই চক্র দেখি। প্রথমে কোনো বাউল বা লোকশিল্পী আল্লাহ খোদা, সৃষ্টি, স্বর্গ নরক, পীর মুরিদ নিয়ে একটু অন্যভাবে বলে তারপর কোনো মসজিদের ইমাম বা ওয়াজিন ক্লিপটা কাটাছেঁড়া করে ভাইরাল করে “ধর্ম অবমাননা”র ভাষা তৈরি হয় তারপর ‘তৌহিদি জনতা’ র ব্যানারধারী মব রাস্তায় নামে, মামলার দাবি তোলে আর পুলিশ রাষ্ট্রের ‘ধর্মীয় সংবেদনশীলতা’র কাছে মাথা নত করে শিল্পীর গলা টিপে ধরে। আবুল সরকারের ক্ষেত্রে সেটাই হলো তার সহশিল্পী রাজু সরকার পরিষ্কার বলেছেন, সম্পূর্ণ পারফরম্যান্সের কনটেক্সট না দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ ঘুরিয়ে তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দোষী বানানো হচ্ছে তিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে না, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
আমার চোখে ভেসে ওঠে নভেম্বরের সেই মানিকগঞ্জের মাঠের আরেকটা ছবি একদিকে আলেম ও তৌহিদি জনতার মানববন্ধন, অন্যদিকে বাউল অনুসারী, থিয়েটার কর্মী, সংগীতশিল্পী আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের মানববন্ধন দু’পক্ষের র্যালি যখন একই এলাকায় এসে মুখোমুখি হলো, তখন খবর এলো, তৌহিদি জনতার দিক থেকে কিছু লোক গরিব কাপড় পরা বাউল ভক্তদের ওপর লাঠি, স্টিক, লোহার রড নিয়ে হামলা চালিয়েছে, বেশ কয়েকজন আহত, কারও মাথা ফেটেছে, কারও হাত ভেঙেছে। নরওয়েজিয়ান সাপোর্ট গ্রুপ, Mimeta র রিপোর্ট, ইউরোপীয় আর্ট ফান্ডের অ্যালার্ট সব জায়গায় লেখা, “একটি স্থানীয় ব্লাসফেমি অভিযোগ কয়েক দিনের মধ্যে বৃহত্তর মব হিংসায় রূপ নিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু বাউল ও মরমি সংস্কৃতি।”
সমস্যাটা যখন কোরানের আয়াত এবং হাদিসেরঃ নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা ব্যভিচার (জিনা), রেশমী পোশাক (পুরুষদের জন্য), মদ (খামর) এবং বাদ্যযন্ত্র (মা’যিফ) হালাল বা হালাল বলে গণ্য করবে।” (সহীহ আল-বুখারী, ৫৫৯০)
এই হাদিসে ‘মা’যিফ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত আরবি ভাষায় সকল ধরণের বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ করে তারযুক্ত এবং বায়ু যন্ত্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই হাদিসের যুক্তি খুবই শক্তিশালী। এখানে, বাদ্যযন্ত্রগুলিকে ব্যভিচার এবং মদের মতো স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ জিনিসের সাথে একই সারিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে, ফিকহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্রের অনেক ইমাম, যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের অনুসারীদের একটি বড় অংশ, বাদ্যযন্ত্র সহ সঙ্গীতকে হারাম বা নিষিদ্ধ বলে রায় দিয়েছেন।
‘মা’যিফ’ সম্পর্কে বুখারী হাদিস হল মূল নীতি। এটি সকল ধরণের বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ করে। ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল সাদ্দ আল-যারাই, যার অর্থ এমন কাজ নিষিদ্ধ করা যা সরাসরি হারাম নয় কিন্তু হারামের পথ খুলে দেয়। সালাফি পণ্ডিতরা এই নীতিটি সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। তাদের যুক্তি হল সঙ্গীত নিজেই কেবল সুরের সমষ্টি হতে পারে, কিন্তু এটি প্রায়শই মানুষকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেয়। সঙ্গীত মানুষের মনে যৌন আকাঙ্ক্ষা (শাহওয়া) জাগিয়ে তোলে, যা ব্যভিচার (জিনা) এর দিকে পরিচালিত করতে পারে। সঙ্গীত মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে, যা সময়ের অপচয়। পপ কনসার্ট বা সঙ্গীত অনুষ্ঠান পুরুষ ও মহিলাদের অবাধ মেলামেশা, মাদক এবং বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করে। অতএব, এই সমস্ত কুকর্ম প্রতিরোধ করার জন্য সঙ্গীতকে মূল থেকে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।
সালাফিদের জন্য, ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের মতে, কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা ইবাদতের পদ্ধতি কঠোরভাবে নির্ধারিত। এর বাইরে যে কোনও নতুন সংযোজন একটি বিদআত, এবং ‘প্রতিটি বিদআতই একটি বিচ্যুতি’। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সুফিদের ‘সামা’ বা সঙ্গীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনা একটি গুরুতর বিদআত। তাদের যুক্তি হলো, নবীজি বা তাঁর সাহাবীরা কেউই সঙ্গীতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাননি। অতএব, এটি একটি নিষিদ্ধ এবং বিচ্যুতি।
আধুনিক পপ, রক, হিপ-হপ বা সিনেমার গানকে সালাফিরা পশ্চিমা বা অমুসলিম সংস্কৃতির (তাশাব্বু বিল-কুফফার) অন্ধ অনুকরণ হিসেবে দেখেন, যা হাদিসে নিষিদ্ধ। তাদের মতে, এই ধরনের সঙ্গীত কেবল সুর বা বাদ্যযন্ত্রের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনধারার অংশ, যা বস্তুবাদ, ভোগবাদ এবং নৈতিক অবক্ষয়কে তুলে ধরে। ইসলামী পরিচয় রক্ষার জন্য এই ‘সাংস্কৃতিক আক্রমণ’ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।
নবী মোহাম্মদের এইসকল মূর্খতা আর কঠোর দমন নীতিমালা যা বর্তমান যুগে হাস্যরসে পরিণত হয়েছে, এবং যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক,এই সত্যতা নিয়ে লিখলে কট্টর মৌলবাদীরা আমাদেরকে জবাই করে হত্যার কথা বলে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্ধি করে রাখে। এক গণ্ড মূর্খের জাতিতে পরিতন করতে চায় আমাদের কারণ কেউ প্রতিবাদ করতে পারবে না। যারা করবে তাদেরকেই মেরে ফেলবে। বাংলাদেশের এই মৌলবাদী জনগোষ্ঠী আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গুলো এগুলো সব হোল অসভ্য, উন্মাদ, জিহাদি আর বর্বর।
এখানে আমার ভেতরের দ্বৈত ক্লান্তি খুব তীব্রভাবে ফিরে আসে। একদিকে, আওয়ামী লীগের যুগে ভাস্কর্য, মাজার, শিল্প, সংস্কৃতি সবকিছু প্রকাশ্যে ব্যবহার হয়েছে পার্টি প্রচারের মঞ্চ হিসেবে যারা সরকারের মুখপাত্র ছিল না, তাদেরও অনেককে চুপ থাকতে হয়েছে ভয়ে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পতনের পর যে ‘ধর্মীয় গণতন্ত্র’ আসার কথা ছিল, সেখানে দেখি, লালন, আজিজ শাহ, ফকির লালন সাই, শাহ আবদুল করিম এই সুরের ধারার মানুষদের ওপরই আক্রমণ বাড়ছে, “মাজারে গিয়ে ফাতা পড়া হারাম”, “দরগা সুন্নত নয়”, “বাউলদের গান শিরক” এইসব স্লোগান নতুন করে জেগে উঠছে, আর একই সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক ড্রেস কোড, প্রাইমারি স্কুলে সংগীত শরীরচর্চা শিক্ষক বাতিল, বাউল শিল্পীর ওপর ব্লাসফেমি মামলা সব একসাথে মিলিয়ে একটা ভয়ংকর ছবিতে পরিণত হচ্ছে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারী হিসেবে আমার নিজের বেঁচে থাকার জায়গা বাউল সুরের ভেতরেই অনেক বার খুঁজে পেয়েছি। লালনের গানে যখন শুনেছি, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”, তখন মনে হয়েছে, কোনো এক ঈশ্বরকে ভয় না পেয়েও প্রেম আর মানবতায় থেকেও বাঁচা যায়। যখন পরিবার, মসজিদ, সমাজ আমার bisexual পরিচয় আর অবিশ্বাসের কারণে আমাকে “অসুস্থ”, “বিকৃত”, “অশ্লীল” বলেছে, তখনই বাউল গান, লোকনাট্য, রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখার একটা ভাষা পেয়েছি। আজ দরগায়, বাউল আখড়ায়, মাজারে আক্রমণ, বাউল শিল্পীদের বিরুদ্ধে মামলা সব দেখে মনে হয়, যে সামান্য নিশ্বাসের জায়গাটুকু ছিল, সেটাও কেড়ে নিতে চাইছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। ভারতীয় আর আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলোতে অংশগ্রহণকারী ফারহাদ মজহার, কবি বুদ্ধিজীবীরা রাস্তা থেকে স্লোগান দিচ্ছেন “এটা নতুন ধরনের রিলিজিয়াস ফ্যাসিজম, যার যাত্রা ৫ আগস্টের মাজার দখল থেকে শুরু হয়ে এখন বাউলের গলা টিপে ধরেছে।”
আবুল সরকারের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে না, দণ্ডবিধির ধারা নির্ভর ১৫৩, ২৯৫এ, ২৯৮ যেমনটা রিতা দেওয়ানের এক মামলায়ও ছিল এর ভেতরে একটা ধোঁকাও আছে। সরকার বলতে পারে, “দেখুন, আমরা ডিএসএ ব্যবহার করছি না সাধারণ আইনেই ব্লাসফেমি জাতীয় অপরাধের বিচার করছি”, যেন এভাবে তারা গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবে একই কাজ হচ্ছে “ধর্মীয় অনুভূতি”র অস্পষ্ট, সব খেকো ধারণার ভেতরে যে কোনো ভিন্ন সুর, প্রশ্ন, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ সবকিছুকে গিলে ফেলা। ThePrint, NDTV, Hindustan Times, Telegraph এর রিপোর্টগুলো বলছে, এই মামলার পেছনে Hefazat, খিলাফত মজলিশ, তৌহিদি জনতা একাধিক ইসলিস্ট গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা আছে তারা আগেই নারীর ফুটবল, সুফি উৎসব, মাজার উৎসব বন্ধ করেছে এখন বাউলদের গানের ভেতরে “ধর্মীয় অপরাধ” খুঁজে বের করছে।
আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর লাগে এই নীরবতা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস নিজে কোনো কঠোর বিবৃতি দেননি তার প্রেস অ্যাডভাইজার একে “দুঃখজনক” বলেছেন, সংস্কৃতি উপদেষ্টা ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, “ঘটনাটা খুব সেনসিটিভ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকি সতর্কতার সাথে দেখছে।” অন্যদিকে ওই একই সরকারের অধীনে পুলিশকে এখন পর্যন্ত বাউলদের ওপর হামলাকারী তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো গ্রেপ্তার বা মামলা করতে দেখা যায়নি NDTV ও অন্যান্য সূত্র বলছে, আবুল সরকারের ওপর হামলার প্রতিবাদে গঠিত মানববন্ধনে গিয়ে যখন বাউল সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে, তখন কেউ আটক হয়নি। মানে রাষ্ট্র একদিকে ধর্মীয় মবকে রাস্তায় জায়গা দিচ্ছে, অন্যদিকে শাস্তির ভাষা ব্যবহার করছে শিল্পীর বিরুদ্ধে এই অসম যুদ্ধের ফলাফল আমরা আগেই অনেকবার দেখেছি।
এখানে আবার ফিরে আসে আমার নিজের ব্যক্তিগত প্রশ্ন: এই দেশে কাকে রক্ষা করতে গিয়ে কাকে হত্যা করা হচ্ছে? আল্লাহ যদি সত্যিই থাকেন, সর্বশক্তিমান হন, তবে কি তিনি আবুল সরকারের কণ্ঠস্বরের সামনে এতটাই ভঙ্গুর যে রাষ্ট্রের ডিবি পুলিশ, ওয়াজিন আর তৌহিদি জনতার মিছিলে তাকে রক্ষা করতে হবে? নাকি আসলে এরা আল্লাহকে না, নিজেদের ভঙ্গুর ক্ষমতাকে রক্ষা করছে যে ক্ষমতা প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, যে ক্ষমতা প্রেমের অন্যরকম ভাষা বুঝতে পারে না, যে ক্ষমতার গায়ে আঁচড় পড়লে মাজার, ভাস্কর্য, গান সব ভেঙে ফেলার ইচ্ছে জাগে।
বাউলের একতারায় ধর্মের ইমান টলে যায় কি না, সেই প্রশ্ন নিয়ে আমরা রিতা দেওয়ানের কেসে আগেই লিখেছি আজ আবুল সরকারের গ্রেপ্তার আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে, এই সমাজের ‘ইমান’ টলাটা আসলে একটা রাজনৈতিক প্রজেক্ট। যে ইমান এক টুকরো গান, এক টুকরো মুখোশ, এক টুকরো ভাস্কর্য, এক টুকরো মাজারের ফতেহা সহ্য করতে পারে না, সে ইমান আসলে ভয় আর ঘৃণার ওপর দাঁড়ানো এক ক্ষমতাকাঠামো। সেই কাঠামোর গায়ে আঁচড় দেয় বলেই বাউলদের গলা এত বিপজ্জনক। আর তাই আবুল সরকারের গ্রেপ্তার শুধু একজন শিল্পীর বিচার না এটা এই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের পরীক্ষা এই পরীক্ষা আমরা যদি বারবার ফেল করি, তাহলে খুব শিগগিরই গান গাওয়া তো দূরের কথা, নিঃশ্বাস নেওয়ার সুরও আমাদের কাছে সন্দেহজনক অপরাধ হয়ে দাঁড়াবে।