Fri, Feb 6, 2026

শিক্ষকের গলায় দড়ি: জোরপূর্বক পদত্যাগ ও সাম্প্রদায়িকতা

শিক্ষকের গলায় দড়ি: জোরপূর্বক পদত্যাগ ও সাম্প্রদায়িকতা
  • PublishedOctober 19, 2024

হাসিনার পতনের ঠিক পরের কয়েক সপ্তাহ যেন এক উল্টোদিকের ঝড়। যে ছাত্ররা জুলাই আগস্টে রাষ্ট্রের গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, তাদেরই এক অংশ হঠাৎ “বিচারের” নামে শিক্ষক শিকার শুরু করল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ৪৯ জন শিক্ষককে ৫ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে এমন তথ্য তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য পরিষদ, যা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ছাত্র শাখা এর মধ্যে ১৯ জন পরে কিছুটা চাপের মুখে আবার reinstatement পেলেও অন্তত ৩০ জন স্থায়ীভাবে চাকরি হারিয়েছেন। এদের বেশির ভাগই সরকারি স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যাদের ওপর অভিযোগ ছিল দুটি শব্দে: “আওয়ামী লীগার” আর “ইসলামবিদ্বেষী।”
 
মাঠের চিত্র আরও অস্বস্তিকর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে তার অফিসে ঘিরে দুই ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, ক্লাসরুমে ঢুকতে দেওয়া হয় না, অবশেষে ছাত্রদের চাপের মুখে তাকে সাদা কাগজে পদত্যাগপত্র লিখতে বাধ্য করা হয়, পরে তিনি বলেন, নিজের আর পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে তিনি সই করেন। বরিশালের বকরগঞ্জ কলেজের হিন্দু নারী প্রিন্সিপাল শুক্লা রাণী হালদারকে ঘিরে ছাত্র স্থানীয়রা “দুর্নীতি”, “অপব্যবহার”, “হিন্দু পক্ষপাত” ইত্যাদি অভিযোগ তুলে অবরোধ করে, শেষ পর্যন্ত তাকেও পদত্যাগ করতে হয়। ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুল কলেজ, বিভিন্ন নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে হিন্দু শিক্ষক প্রভাষকদের অফিসে ঘিরে ধরে, গালিগালাজ, জামা কাপড়ে সিগারেটের প্যাকেট স্ট্যাপলার দিয়ে লাগিয়ে অপমান করে, শেষমেষ স্বাক্ষর আদায়ের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই সব “অভিযোগ” শুরুই হয় ছাত্রদের কোনো ব্যক্তিগত অসন্তোষ, ফলাফল নিয়ে ক্ষোভ বা গুজব থেকে, পরে তার গায়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতা বা “ধর্মবিদ্বেষী” তকমা লাগিয়ে বড় আকার দেওয়া হয়।
 
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয়েছে, আমরা যেন একটাই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। গত ১৫ বছরে ছাত্রলীগ, প্রশাসন, গায়ে গতরে “সরকারি ক্ষমতা” নিয়ে শিক্ষক ছাত্রদের ওপর যে সন্ত্রাস চালিয়েছে, এখন তার উল্টোপিঠে দাঁড়িয়ে কিছু ছাত্র গোষ্ঠী একই হিংস্রতা পুনরাবৃত্তি করছে, শুধু টার্গেট বদলে গেছে। একসময় “বিরোধীদলীয়” বা “নাস্তিক” শিক্ষককে ডাকা হত, এখন “হিন্দু”, “আওয়ামী”, “এন্টি ইসলামিক” শিক্ষককে ঘিরে ধরে “জনতার আদালত” বসানো হচ্ছে। দু’দিকেই অনুপস্থিত আইনের শাসন দু’দিকেই ছাত্র রাজনীতির দখলদাররা নিজেরা পুলিশ জজ জল্লাদ হয়ে উঠছে, আর সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী, “অপছন্দের” শিক্ষকরা তাদের হাতে বন্দি।
 
এই জোরপূর্বক পদত্যাগের ঢেউটি নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন কেস না, বরং বড় এক সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের যৌথ তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহে ৫০ এর বেশি জেলায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ২০০ ২৭৮টি সহিংসতা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মন্দির ভাঙচুর, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসবেরই অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে “হিন্দু শিক্ষক বের করো”, “দলীয় শিক্ষক সরাও”, “ইসলামবিরোধী সিলেবাস বাদ দাও” ধরনের দাবি ওঠে অনেক জায়গায় কোরআন হাদিসের “অবমাননা” বা “অশালীনতা”র গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি গরম করা হয়। বাস্তবে দেখা গেছে, যেসব শিক্ষক বছরের পর বছর কোনো সমস্যা ছাড়াই পড়াচ্ছিলেন, তাদের হঠাৎ করেই আগস্টের পর থেকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়, যেন সরকার বদলের সাথে সাথে তাদের নাগরিকত্ব আর পেশাগত নিরাপত্তাও কাগজ থেকে মুছে গেছে।
 
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে বৈঠকে বলেছেন, তিনি কোনো জোরপূর্বক পদত্যাগ বরদাস্ত করবেন না, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন ঘটনাস্থলে থেকেও ছাত্র জনতার চাপের মুখে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারছে না অনেক জেলা শিক্ষা অফিসার, প্রিন্সিপাল, ভিসি বলেছেন, “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে আপাতত পদত্যাগ নেওয়া হয়েছে।” এটা শুধু ভীরুতা না, এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা কারণ এর ফলে বার্তা যায়, “যাকে পছন্দ না, তাকে কিছুক্ষণ ঘিরে ধরে রাখো, ভিডিও করো, সোশালে ছড়াও, শেষে সে ই তো সই করবে।”
 
এই পটভূমিতে “শিক্ষকের গলায় দড়ি” আসলে খুব বাস্তব এক ছবি। কারও গলায় সত্যিকারের দড়ি না থাকলেও, চাকরি হারানোর ভয়, পরিবার সন্তানের নিরাপত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ায় চরিত্রহননের আশঙ্কা, গুজবে “মুরতাদ”, “ব্লাসফেমার”, “দেশদ্রোহী” তকমা — সব মিলিয়ে যেন প্রতিটি সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক শিক্ষক অদৃশ্য ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে প্রতিদিন ক্লাসে যাচ্ছেন। একজন নারী, সংখ্যালঘু, কুইয়ার মানুষ হিসেবে জানি, এই ভয় শরীরে কীভাবে বাসা বাঁধে কীভাবে প্রতিটি লেসন প্ল্যান, ক্লাস ডিসকাশনে মাথার ভেতর এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ কাজ করে, “এটা বললে কাল কে আমার কণ্ঠ বন্ধ করতে চাইবে?”
 
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কয়েকটি জিনিস একসাথে দরকার। প্রথমত, সরকারকে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করতে হবে যে ছাত্র জনতার চাপের মুখে কোনো শিক্ষক কর্মচারীর পদত্যাগ আইনি বৈধতা পাবে না, এমন “রেসিগনেশন” বাতিলযোগ্য বলে গণ্য হবে, আর এর পেছনে যারা উসকানি দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা হবে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট হটলাইন, লিগ্যাল এইড, সেফ হাউজ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে পারবেন। তৃতীয়ত, ছাত্র রাজনীতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, “দলীয় শুদ্ধি অভিযান”, “অ্যান্টি ইসলামিক” তকমা ব্যবহার বন্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নীতি দরকার। নইলে, আজ হিন্দু বা “আওয়ামী” শিক্ষক টার্গেট হলে, কাল “নাস্তিক”, “কুইয়ার”, “নারীবাদী”, “সরকার সমালোচক” সবাই একে একে একই ভাগ্য বরণ করবেন।
 
এইসব হামলা পদত্যাগের ভেতরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিরোধের ছবি আছে — সহকর্মী শিক্ষকরা প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছেন, ছাত্রদের একাংশ “আমাদের শিক্ষককে ফিরিয়ে দাও” প্ল্যাকার্ড ধরেছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এসব জোরপূর্বক পদত্যাগকে রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর অগ্রহণযোগ্য উপায় বলেছে। এই কণ্ঠগুলোই হয়তো ভবিষ্যতে নতুন এক ক্যাম্পাস সংস্কৃতির বীজ বপন করবে, যেখানে শিক্ষককে রাজনৈতিক ট্যাগের ভিত্তিতে নয়, জ্ঞানের উৎস হিসেবে দেখা হবে, আর কারও গলায় অদৃশ্য দড়ি বেঁধে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ক্লাসরুম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে না।