বাঙালির সংস্কৃতি ও ওয়াহাবি আগ্রাসন
বাংলাদেশের ধর্মীয় মানচিত্র কাগজে কলমে সুন্নি মুসলিম হলেও, বাস্তবের ভুবনে এই ইসলামটা শতাব্দীজুড়ে গান, গণেশের মেলা, লালনের দোলা, মাজারের শিরনি, গাজনের ঢাক আর নওয়াজের সুরে মিশে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ২০২৪ থেকে যে দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম, সেখানে এই মিলনভূমিটাই প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে ইসলামী উগ্র গোষ্ঠীর নতুন উত্থান, সব মিলিয়ে সারা দেশে সুফি মাজার ও দরবারের ওপর হামলার এক উদ্বেগজনক ঢেউ দেখা দিল। গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্সের এক বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ থেকে কমপক্ষে ৪০ থেকে ৮০টি মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হামলার ঘটনা ঘটেছে, পুলিশের একটি রিপোর্টে ৪৪টি হামলার কথা উল্লেখ থাকলেও সুফি সংগঠনগুলো আরও বেশি সংখ্যা দাবি করছে।
এই হামলাগুলোর তালিকায় আছে সিলেটের বহুপুরাতন শাহ পরান (রহ.) মাজার, ঢাকার ধামরাইয়ের বুছাই পাগলা, ময়মনসিংহের সাইয়দ কালু শাহ, গাজীপুরের শাহ সুফি ফসিহ পাগলা, নোয়াখালীর ফকির চারু মিঝি শাহ, চট্টগ্রামের বড় আউলিয়া, নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ দরবার, ঠাকুরগাঁওয়ের বিবি সখিনা, নরসিংদীর একাধিক পাগলা দরবার সহ অসংখ্য স্থানীয় আধ্যাত্মিক আস্তানা। কোথাও রাতে গিয়ে গম্বুজে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হয়েছে, কোথাও মাজারের মিনারে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে ভেঙে ফেলা হয়েছে, কোথাও তীর্থযাত্রীদের মাথায় লাঠি, টিনের শেড, তাঁবু, গাজন মেলা, মাইক সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলাকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের “তওহিদি জনতা”, “সিরাতুল মুস্তাকিম”, “ওয়াহাবি তাওহিদি সংগঠন” ইত্যাদি নামে পরিচয় দিয়ে বলেছে, মাজার কেন্দ্রিক গানের আসর, নৃত্য, শিরনি, মানত, মিলাদ সবই “বিদআত” আর “শিরক” তাই এগুলো ধ্বংস করা “ধর্মীয় কর্তব্য।”
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই হামলাগুলোর মধ্যে শুধু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নয়, বাঙালিত্বের মূলে আঘাত দেখতে পাই। লালন, শাহ পরান, শাহ জালাল, গাজী পীর, শাহ সূফি ফকির এইসব মাজারের চারপাশেই গড়ে উঠেছে বাংলা গানের এক ধারাবাহিকতা, যেখানে মুসলমান হিন্দু, নারী পুরুষ, কৃষক শ্রমিক, কুইয়ার অসামঞ্জস্য সবাই নিজের মতো করে “দরবারে” গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ওয়াহাবি সালাফি ভাবধারার চোখে এই সবই “কুসংস্কার”, “হারাম”, “সরাসরি কুরআন হাদিসবিরোধী”। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ মানে, কোনো গানের মেলা থাকবে না, কোনো ধুনিয়া পাগলা থাকবে না, কোনো নারী পুরুষ একসাথে নাচবে না, কোনো তবলচি রাতভর গাইবে না শুধু একরঙা, বিধিনিষেধ ভরা, নিঃসঙ্গ এক বিশ্বাসের চাদর।
শাহ পরান মাজারের সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষটা এই দ্বন্দ্বকে খুব স্পষ্ট করে দিল। বহু শতাব্দীর পুরোনো এই দরবারে বার্ষিক ওরশে ফকির, ভক্ত, দরবেশ, সুফি অনুসারীদের ভিড় হয় একদল মাদরাসা শিক্ষক ও স্থানীয় মুসল্লি অভিযোগ তুললেন, ওরশের নামে এখানে নাকি “নেশা, নাচ গান, বেহায়াপনা” চলছে, তাই রাতের বেলা মাইকে ঘোষণা করে তারা এইসব বন্ধের দাবি তুললেন। অন্যদিকে মাজার কর্তৃপক্ষ আগে গান কিছুটা সীমিত করলেও, এবার আরেকদল ফকির অনুসারী ঘোষণা দিল, সঙ্গীত বন্ধ হবে না, বরং বাড়বে। ঠিক এই টানাপোড়েনের রাতে শতাধিক লাঠিধারী মাদরাসা ছাত্র শিক্ষক মাজার প্রাঙ্গণে হামলা করে, ফকির দরবেশদের উপর চড়াও হয়, টেন্ট তাঁবু শেড দোকান ভেঙে দেয়, কয়েক ডজন মানুষ আহত হয় পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। পরে “সামাজিক ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ কমিটি” নামের এক মঞ্চ গড়ে উঠে, যারা খোলাখুলিভাবে “ঠকবাজ দরবার পোড়াও” স্লোগান দেয়।
এটি নিছক “ধর্মীয় ভ্রান্তি” না, বরং সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার ম্যাট্রিক্সের সাথে যুক্ত। ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পর যখন নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামী দলগুলোর দাবির সামনে কিছুটা নরম সুর নিল, তখন ওয়াহাবি ঘেঁষা গোষ্ঠী ধরে নিল, এখনই “মাঠ দখল” করার সেরা সময়। নানা জায়গায় তারা শুধু মাজার মসজিদ নয়, হিন্দু মন্দির, কীর্তন ঘর, লোকসঙ্গীত মেলা, লালন স্মরণোৎসব এসবের ওপরও হামলা চালিয়েছে, যাতে সমগ্র বহুমাত্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতিকে এক ঘাটে নামিয়ে আনা যায়। Sufi নেতা, তারিকত ফেডারেশন দাবি করেছে, ২০২৪ থেকে কমপক্ষে ৮০টির বেশি মাজারে হামলা হয়েছে অনেক দরবার নিরাপত্তার ভয়ে নিয়মিত শনি সোমের সঙ্গীত আসর বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, মাজার দরবারসহ সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনার ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানো হবে কেয়ারটেকার সরকারের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুরের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে মাঠে থাকা সুফি অনুসারী আর সংখ্যালঘুরা এখনো ভয়ের মধ্যে আছেন অনেকে দিন রাতে পালা করে মাজার পাহারা দিচ্ছেন, কেউ ঠাকুরগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, নরসিংদীতে গড়ে উঠেছে “দরবার রক্ষা কমিটি”, যারা নিজেরাই লাঠি হাতে রাত জাগছেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা আমাদের সবার জন্যই বাঙালির ইসলাম কি হবে মাজার গান শোক আনন্দের মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক, নরম স্রোত, নাকি সোজা লাইনের ওয়াহাবি কড়াকড়ির কপি পেস্ট? মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন পাকিস্তানি মিলিটারি আর তাদের মিত্ররা বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আঘাত করে, গান, থিয়েটার, বাউল, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে “অশ্লীলতা” বলে দেগে দিয়েছিল, আজকের এই মাজার বিরোধী হামলাগুলোও সেই একই ধারার নতুন কায়ায় ফিরে আসা।
একজন নাস্তিক, উভকামী, নারীবাদী হিসেবে, আমি মাজারে গিয়ে মানত বাঁধতে না পারলেও জানি, এসব জায়গা প্রান্তিক মানুষ, নারী, কুইয়ার, অসুস্থ, নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য কত বড় আশ্রয়। যখন মসজিদ, মন্দির, গির্জা, রাষ্ট্র, পরিবার সবাই কাউকে বাইরের মানুষ বানিয়ে দেয়, মাজার তখনও তাকে বলে, “এসো, বসো, একটু গান শুনো, একটু কাঁদো।” সেই আশ্রয়ের ওপর হামলা মানে কেবল কোনো “ভুল আচার” ভাঙা না, বরং প্রান্তিকতার শেষ আড়ালটুকু ছিঁড়ে ফেলা। এই আক্রমণকে রুখতে না পারলে, আগামী প্রজন্ম হয়তো একদিন শুধু বইয়ে পড়বে, “এই দেশে একসময় লালন ফকির ছিল, মাজারে গান হত, মানুষ ধূপের গন্ধে মাথা রাখত পাথরের গায়ে।” আর আমাদের বর্তমান প্রজন্মের লজ্জা হবে এই ভেবে, আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বাঙালির সেই বহুলতা পোড়াতে দিয়েছিলাম।