Fri, Feb 6, 2026

পূজায় হামলা কি ধর্মরক্ষা নাকি রাজনীতি?

পূজায় হামলা কি ধর্মরক্ষা নাকি রাজনীতি?
  • PublishedOctober 26, 2023

বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এলেই এখন হালকা কাঁপুনি ধরে, শুধু ঢাকায় বসে থাকা হিন্দুদের নয়, দূরে বসে থাকা আমাদেরও। যে উৎসব এক সময় ছিল আনন্দ, আলোর, মণ্ডপ দর্শনের, সেটা এখন হয়ে উঠেছে টেনশনের মরসুম, এবার কোথায় আঘাত হবে, কোন মন্দিরে মূর্তি ভাঙবে, কার বাড়িতে আগুন লাগবে। ২০২১ সালের ভয়াবহ হামলাগুলোর পর থেকে পুরো দেশই জানে, একটা গুজব, একটা ফেসবুক পোস্ট, একটা ছবি, একটা ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিও কত দ্রুত হাজার হাজার উন্মত্ত মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারে, আর সেই ভিড় মুহূর্তে মণ্ডপ, মন্দির, বাড়িঘর, দোকানে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্গাপূজার সময়, আর তার আগে পরে, হিন্দু মন্দির মণ্ডপ বাসস্থানে হামলা একটা ধারাবাহিক pattern, মূর্তি ভাঙচুর, আগুন, লুটপাট, প্রাণহানি, সব মিলিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধটা যেন প্রতি অক্টোবরেই নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
 
সরকারি ভাষণ অবশ্য আলাদা ছবি আঁকে, “কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা”, “দুর্বৃত্তদের চক্রান্ত”, “আমাদের দেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ”, “দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।” কিন্তু হিন্দু সংগঠন, মানবাধিকার গোষ্ঠী আর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ভাষা অনেক বেশি কঠিন। ব্রিটিশ হোম অফিসসহ নানা রিপোর্টে লেখা আছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিন্দু মন্দির আর পুজা মণ্ডপে হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন, এসব ঘটনার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতার অনুসারী, আর পুলিশের ভূমিকা সন্দেহজনক, কখনও তারা দেরিতে আসে, কখনও চুপ থাকে, কখনও আবার ভিকটিমের ওপরই উল্টো চাপ তৈরি করে। ২০২১ সালের কমিলা নোয়াখালীর হামলার পরও সরকার প্রচুর মামলা করেছে, অনেককে গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু হিন্দু নেতৃত্ব বারবার অভিযোগ করেছে, আসল পরিকল্পনাকারী, রাজনৈতিক ধর্মীয় মাস্টারমাইন্ডদের বেশিরভাগই ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
 
প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক, এগুলো কি সত্যি কেবল “ধর্মীয়” হামলা, নাকি ধর্মকে ব্যবহার করে অন্য উদ্দেশ্য সাধনের রাজনীতি? দুর্গাপূজার সময় হামলার pattern দেখলে কিছু জিনিস খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো হয়, কোথাও নাকি কোরআন অবমাননা হয়েছে, কোথাও নাকি দেবীর পায়ের নিচে পবিত্র গ্রন্থ রাখা হয়েছে, কোথাও নাকি হিন্দু যুবক নবী বিদ্বেষী পোস্ট করেছে। তারপর মসজিদ থেকে মাইক, ওয়াজ মাহফিল, স্থানীয় উগ্র গোষ্ঠীর মিছিল, সব মিলিয়ে একটা উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। আর তার গায়ে যদি একটু রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী টানাপোড়েন, সরকার বিরোধী বা সরকার সমর্থক হিসাবনিকাশ যোগ হয়, তাহলে সংখ্যালঘুদের বাড়ি দোকান, মন্দির খুব সহজেই “বার্তা পাঠানোর” লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়।
 
অর্থাৎ, ধর্ম এখানে মূলত জ্বালানি গাড়িটা চালাচ্ছে রাজনীতি, ভোটের সমীকরণ, জমি বাণিজ্য দখল, এলাকায় আধিপত্য, প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়া। ২০২৪ এর পরবর্তী সহিংসতার বিশ্লেষণে তো স্পষ্ট উঠে এসেছে, হিন্দুদের ওপর হামলার বড় একটা অংশ ছিল রাজনৈতিক প্রতিশোধ কেউ আওয়ামী লীগপন্থী বলে টার্গেট হয়েছে, আবার কোথাও বিএনপি শিবিরের সঙ্গে হিসাবনিকাশ, কোথাও ভূমি দখল, এসবই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য, ধর্ম ছিল শুধু convenient justification। কিন্তু মাটির মানুষ, মন্দিরের পুরোহিত, গরু ছাগল দোকান বাঁচাতে দৌড়ানো সাধারণ হিন্দুর কাছে কোনো ব্যাখ্যাতেই তাদের পোড়া ঘর, ভাঙা মূর্তি, নিহত আত্মীয়ের শোক কমে না। তাদের জন্য প্রতিবারই বাস্তবতা একটাই, দুর্গাপূজার সময় নিজের দেশেই তারা “অনাহূত অতিথি”, শিকড়সহ উপড়ে ফেলা যায় এমন গাছ।
 
একজন নাস্তিক, উভকামী, নারীবাদী নারী হিসেবে এই সহিংসতাকে শুধু ধর্মভিত্তিক না, বরং বহুমাত্রিক নিপীড়ন হিসেবে দেখি। হিন্দু নারী তখন দ্বিগুণ তিনগুণ ঝুঁকিতে থাকে, ঘর হারানোর, শরীর হারানোর, সম্মান হারানোর। মন্দিরে হামলার গল্পের ভেতরে কত মেয়ের গায়ে হাত পড়েছে, কতজন রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে শহরে পালিয়ে গেছে, কতজনের বিয়ে ভেঙে গেছে, কতজনকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে শরণার্থী হয়ে থাকতে হয়েছে, এসব খুব কমই উঠে আসে রিপোর্টে। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতার রিপোর্টগুলো বারবার বলছে, বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যায় কমে যাচ্ছে, আর তার পেছনে আছে ধারাবাহিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা কিন্তু আমরা এখনও সান্ত্বনা খুঁজি “ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ” বলে স্লোগান দিয়ে।
 
সবচেয়ে ভণ্ডামি লাগে যখন দেখি, প্রতিবার হামলার পর মন্ত্রী আমলারা মন্দিরে গিয়ে ফুল দিয়ে, ভাঙা মূর্তি দেখে ছবি তুলে, আশ্বাস দিয়ে চলে আসেন, “দোষীদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।” পরের বছর আবার একই স্ক্রিপ্ট, শুধু স্পট বদলায়, নোয়াখালী না হয়ে হয়তো এবার কুমিল্লা, কুমিল্লা না হয়ে হবিগঞ্জ, গাজীপুর, খুলনা। যদি সত্যিই দোষীরা শাস্তি পেত, হামলার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক লাভটা বন্ধ হয়ে যেত, তাহলে এই পুনরাবৃত্তি হত কেন? বরং বরাবরের মতোই দেখা যায়, দু একটা “উন্মাদ” বা “বখাটে”কে গ্রেপ্তার দেখিয়ে, মূল পরিকল্পনাকারীদের অন্ধকারে রেখে, আবার সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়, পরবর্তী হামলা পর্যন্ত।
 
তাই “ধর্মরক্ষা নাকি রাজনীতি”, এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে বেশ সোজা। ধর্ম এখানে ছুরি, রাজনীতি তার হাতল। যে হাতল ধরেছে, সে চাইলে আজ হিন্দুর মন্দিরে ছুঁড়বে, কাল আহমদিয়া মসজিদে, পরশু বাউল বা হিন্দি গানের অনুষ্ঠানে। লক্ষ্য সবসময় একই, মাঝখানের গরিব, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতার বার্তা পাঠানো।
 
এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নই করতে হবে, আমরা কি শুধু “ধর্মীয় সম্প্রীতি” নিয়ে গান গাইব, নাকি সরাসরি বলব, “হিন্দুদের ওপর হামলা রাজনৈতিক অপরাধ, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, আর আমাদের নীরবতার ফল”? যে দিন দুর্গাপূজা সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে, সে দিন হয়তো আমরা আবার মণ্ডপের আলোকে শুধু দেবীর মুখ দেখব, ভাঙা কাঁচ, পোড়া ভিটামাটি আর রক্তমাখা ধূপকাঠির গন্ধ নয়। তার আগে পর্যন্ত প্রতিটা ভাঙা মূর্তি, প্রতিটা ভীত সন্ত্রস্ত হিন্দু পরিবারের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে, ধর্মরক্ষা নয়, এটা খাঁটি ক্ষমতার রাজনীতি আর সেই ক্ষমতা লোভই আমাদের সামষ্টিক মানবতাকে বারবার ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।