নারীর পোশাক থেকে কুইয়ার অস্তিত্ব, সবকিছুর ওপরই ফতোয়া
জুলাই বিপ্লবের এক বছর পরের বাংলাদেশে রাস্তাগুলো এখন যেন নতুন এক আদালত, যেখানে বিচারকের চেয়ারে বসেছে “তওহিদি জনতা”, আর আসামির কাঠগড়ায় নারী, কুইয়ার আর যে কেউ, যার জীবন আর শরীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় ছাঁচে ফোটানো নয়। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ দেখিয়েছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৫ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৫০টির বেশি ঘটনায় সুফি মাজার ভাঙচুর, লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান বন্ধ, নারীদের পোশাক নিয়ে হয়রানি, নারী-ফুটবল ম্যাচ বাতিল, নাট্যোৎসব স্থগিত, এমনকি স্কুলে সঙ্গীতশিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তও উগ্রদের চাপে স্থগিত হয়েছে সবকিছুই “ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা”র নামে। ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মীকে ওড়না ঠিকমতো না দেওয়ার অভিযোগে রাস্তায় টেনে নেওয়া, কক্সবাজারে সৈকতের দুই তরুণীকে পোশাকের জন্য হেনস্তা, মোহাম্মদপুরে সিগারেট খাওয়ায় দুই তরুণীকে মারধর, নারীদের সংস্কার কমিশনের সদস্যদের “বেশ্যা” “কলগার্ল” বলে গালি দেওয়া , এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন খবর না, বরং এক সুসংগঠিত মরাল পোলিসিং এর অংশ।
এই ফতোয়ার রাজনীতির নিচে কুইয়ার মানুষের জীবন আরও বেশি অদৃশ্য আর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আউটরাইট ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দেশ-বিশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের সময় রাস্তায় যে হিজড়া, লেসবিয়ান, গে, বাই মানুষরা গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে নেমেছিল, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ঠিক তারাই “অশালীনতা” আর “পশ্চিমা এজেন্ডা”র নামে উগ্রদের প্রথম টার্গেট হয়েছে নারীবাদী আর কুইয়ার কর্মীরা অনলাইনে যৌন গালি, ধর্ষণের হুমকি, ডক্সিং আর মিথ্যা পর্ন ভিডিও বানানোর হুমকির মুখে একের পর এক প্রোফাইল লক করে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছেন। JusticeMakers Bangladesh আর 76Crimes এর ডেটা দেখাচ্ছে, ২০২৪-এর ৩৯৬ জন এলজিবিটিকিউ ভুক্তভোগীর পর ২০২৫-এর প্রথমার্ধেই অন্তত ২৪০ জন কুইয়ার মানুষ নতুন করে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। খুন, মারধর, বাসা-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, পুলিশি গ্রেপ্তার ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, আর “সমকামীতা প্রচারের” অভিযোগে মামলা পর্যন্ত।
বাংলাদেশের সমকামী বা কুইয়ার মানুষদের জন্য প্রাইড মানে এখন মূলত ফোনের স্ক্রিনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বন্ধ গ্রুপে ভার্চুয়াল পার্টি, নেটফ্লিক্সে কুইয়ার সিরিজ দেখা, আর অনেকটা সময় সোশ্যাল মিডিয়ার হেট কমেন্ট এড়িয়ে চলা। রাস্তায় পতাকা নিয়ে নামার স্বপ্নটা বহু আগেই থেমে গেছে জুলহাজ-তনয়ের হত্যাকাণ্ড আর রেইনবো র্যালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে। সমলিঙ্গ সম্পর্ক এখনো দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় অপরাধ, এলজিবিটিকিউ বিষয়ক কার্যক্রম পুলিশ ও গোয়েন্দাদের রাডারে, আর প্রকাশ্যে পরিচয় জানিয়ে প্রাইড উদযাপন করলে তা “অস্বাভাবিক যৌনাচার” আর “ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ” হিসেবে সহিংসতা ডেকে আনতে পারে এই বার্তাই কুইয়ার কমিউনিটির গভীরে গেড়ে বসে আছে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে এই সময়টাকে নিজের শরীর আর কণ্ঠের চারপাশে ঘনীভূত এক অবরোধ হিসেবে অনুভব করি। যখন দেখি, কোনো পুরুষইউটিউবার মেয়েদের পোশাক নিয়ে হাফঘণ্টার উগ্র ওয়াজ করে লাখো ভিউ পায় আর তার কমেন্টে কেউ কেউ খোলাখুলি লিখে “ধরলে তো এক থাপ্পড়ে ঠিক হয়ে যেত”, তখন বুঝি এই রাস্তার আদালতে অভিযোগপত্র লিখতে খুব বেশি কালি লাগে না। শুধু নারী হওয়া, কুইয়ার হওয়া বা ঈশ্বরকে প্রশ্ন করাই যথেষ্ট। রাষ্ট্র যখন এই রাস্তার ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে, কখনো গা ছাড়া দেয়, কখনো সুযোগ বুঝে তাদের লাগাম টেনে ধরে আবার ছেড়ে দেয়, তখন বোঝা যায় রাস্তার দখল শুধু শারীরিক না আমাদের শরীরের সিদ্ধান্ত, পোশাকের রং, ভালোবাসার মানুষ, ঈশ্বরকে মানা না মানা সবকিছুর ওপরই এই নতুন শাসনের অঘোষিত ফতোয়া জারি হয়ে গেছে। এই মৌলবাদী ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো শরিয়া আইনের দ্বারাই বাংলাদেশের মানবাধিকারকে শেষ করে ফেলতে চায়। যারাই সত্য বলছে সকলকেই ভয়ানক ভাবে মেরে ফেলছে। জামায়েত ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, চরমনাই পীর, খেলাফতে মজলিস এবং মৌলবাদী দল সকলেই এরা ভণ্ড, বর্বর, উগ্র আর বেইমান। এরা সকলেই বিশ্বাসঘাতক।