Wed, Feb 4, 2026

ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়ও রাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপ

ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়ও রাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপ
  • PublishedApril 20, 2025

এপ্রিলের মধ্যভাগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অস্পষ্ট পোস্ট আর স্ক্রিনশটে দেখা গেল গাজীপুরের এক ভাড়া বাসায় পুলিশের অভিযান চলছে অভিযোগ নাকি “সমকামী কার্যকলাপ”। খুব দ্রুতই স্থানীয় কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল আর ফেসবুক পেজ খবর বানিয়ে লিখল পাঁচ তরুণকে সমকামিতার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে দুজন বিবাহিত আর বাকি তিনজন অবিবাহিত পুলিশ নাকি “অশ্লীল অবস্থায়” তাদের ধরে ফেলেছে। পরে সেনাবাহিনী ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা একটি বিবৃতিতে দাবি করলেন অনলাইনে যা ছড়িয়েছে তার বড় অংশই গুজব তবে স্বীকারও করলেন ওই ফ্ল্যাটে অভিযানের কথা সেখানে “অনৈতিক কাজ” আর “মাদক” সংক্রান্ত অনুসন্ধান হয়েছে। এলজিবিটিকিউ অধিকারের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সমকামিতার অভিযোগ না তুললেও বাস্তবে এ ধরনের অভিযানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর রাষ্ট্র যেভাবে নজরদারি আর হস্তক্ষেপ করছে তা কার্যত সমকামী মানুষকে অপরাধী বানানোরই এক রূপ।
 
JusticeMakers Bangladesh in France আর অন্যান্য কুইয়ার অধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কমপক্ষে তিনটি ঘটনায় পুলিশ বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা “সমকামিতা”র অভিযোগে তরুণদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে কখনো থানায় বসিয়ে জেরা করেছে কখনো পরিবারে ফিরিয়ে দিয়ে “ভবিষ্যতে এমন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে” বলে হুমকি দিয়েছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চাঁদপুরে দুজন কিশোরী সমকামী সম্পর্কের অভিযোগে পরিবারের চাপে থানায় সোপর্দ হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে যেখানে পুলিশ তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বদলে পরিবারেই ফিরিয়ে দেয় ফলে তারা আরও সহিংসতা আর জোরপূর্বক বিয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। এদিকে গাজীপুরেই জুলাইয়ে এক সমকামী পুরুষকে বাসায় ডেকে নিয়ে খুন করে তার দুই পরিচিত যুবক পরে স্বীকার করেছে তার যৌন অভিমুখিতা জেনে ব্ল্যাকমেইল আর ডাকাতির পরিকল্পনা ছিল যা ভেস্তে গেলে তাকে ছুরি মেরে হত্যা করে পালিয়ে যায় এই ঘটনা দেখায় সমকামী হওয়া কেবল সামাজিকভাবে নয় জীবননাশের ঝুঁকির দিক থেকেও কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
 
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে গাজীপুরের ঘটনাকে দেখি শুধু পাঁচজন নাম না জানা তরুণের খবর হিসেবে নয় বরং রাষ্ট্র আর সমাজ হাতে হাত মিলিয়ে আমাদের শয্যা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে। বাংলাদেশে এখনো দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় “অস্বাভাবিক সহবাস” অপরাধ হিসেবে রয়ে গেছে যদিও বাস্তবে খুব কম মামলাই এর অধীনে চালানো হয় কিন্তু এই ধারার অস্তিত্ব পুলিশের হাতে এক অদৃশ্য অস্ত্র হিসেবে থেকে যায় যে কোনো সময় কুইয়ার মানুষকে গ্রেফতার ব্ল্যাকমেইল বা হুমকি দেওয়ার জন্য। যখন দেখি সৈন্যবাহিনী পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় “ভুল তথ্য প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা”র সতর্কতা দিচ্ছে আর নাগরিকদের শোবার ঘরে কে কাকে ভালোবাসে তা নিয়ে গুজব ছড়ানোকে জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনায় টেনে আনা হচ্ছে তখন বুঝি আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আসলে কতটা ভঙ্গুর আর কুইয়ার শরীর রাষ্ট্রের কাছে কত সহজে তল্লাসি করার জায়গা হয়ে যায়।