Wed, Feb 4, 2026

বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফোবিয়া এবং শিক্ষিত সমাজের নগ্ন রূপ

বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফোবিয়া এবং শিক্ষিত সমাজের নগ্ন রূপ
  • PublishedNovember 24, 2023

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ঘটনা দেখে বুকের ভেতর এক ধরনের বমি আসা ঘৃণা আর ক্লান্তি একসাথে জমে ওঠে। হোচেমিন ইসলাম, একজন ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী, নার্স, বাংলাদেশেরই নাগরিক, তাকে ডাকা হয় “উইমেন’স ক্যারিয়ার কার্নিভাল”-এ, যেখানে নাকি কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি, নারীর ক্যারিয়ার নিয়ে কথা হবে। ঠিক তার আগের রাতে জানানো হয়, তিনি আর বক্তা থাকতে পারবেন না। কারণ, কিছু শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষা বয়কট করবে, অশান্তি সৃষ্টি করবে, যদি “এলজিবিটি এজেন্ডা” ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তখন “নিরাপত্তা দিতে পারব না” অজুহাতে, আসলে নিজেদের মেরুদণ্ডহীনতা আর কুসংস্কারকে সুরক্ষিত রাখতে, একজন প্রান্তিক মানুষকে গেট থেকেই ফিরিয়ে দেয়। এটাই আমাদের তথাকথিত “এলিট”, “শিক্ষিত” সমাজের নগ্ন রূপ, যেখানে ক্যারিয়ার ফেয়ারে টেড স্টাইল টক, সিভি ওয়ার্কশপ, কর্পোরেট নেটওয়ার্কিং সব চলবে, কিন্তু একজন ট্রান্স নারীর শরীর, কণ্ঠ, অভিজ্ঞতা, এসব নাকি খুব বেশি “ঝুঁকিপূর্ণ”।
 
ঘটনাটা আরও বিব্রতকর, কারণ প্রতিবাদকারীরা নিজেদের যুক্তি সাজিয়েছিল “আইনের শাসন” আর “নৈতিকতা” দিয়ে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে চিঠি লিখে বলেছে, হোচেমিনের উপস্থিতি নাকি ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে যায়, কারণ তিনি “এলজিবিটি প্রচার” করছেন, যা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী অপরাধ। এই চিঠি, তার স্ক্যান কপি, তার সঙ্গে হোচেমিনের ছবি ঘুরেছে একটা ক্লোজড ফেসবুক গ্রুপে, “ইসলামিক প্র্যাকটিশনার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি”, যেখানে খোলাখুলিভাবে লেখা হয়েছে, ক্যাম্পাস “ট্রান্স ফ্রি” রাখতে হবে, না হলে আন্দোলন চলবে। একই সময়ে, বাংলাদেশি রাষ্ট্রই আবার ২০১৩ সাল থেকে হিজড়া কে আলাদা লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, আইডি কার্ড, পাসপোর্ট দিচ্ছে, কিছু কোটাও রেখেছে, অর্থাৎ সরকারি ভাষায় অন্তর্ভুক্তি, আর ক্যাম্পাসের বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা।
 
এটাই বাংলাদেশের “শিক্ষিত সমাজ” নামে পরিচিত সেই শ্রেণি, যারা নিজেদের গর্ব করে, ইংরেজি মিডিয়াম, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, ডিবেট, মডেল ইউএন, ডাইভারসিটি, ডিইআই এর ভাষায় কথা বলে। কিন্তু যখন সেই ডাইভারসিটি বাস্তব কারও শরীর হয়ে গেটের সামনে দাঁড়ায়, তখন তারা হঠাৎ করে ধর্ম আইন সংস্কৃতি জাতীয়তা সব এনে কাঁধে তুলে নেয়, যেন একজন ট্রান্স নারীর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে ওঠা দেশদ্রোহিতার সমান। আইনের যে ৩৭৭ টা একেবারে স্পষ্টভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের consensual সম্পর্ককে অপরাধ বানিয়ে রেখেছে, যেটা উপনিবেশিক সমকামবিদ্বেষের relic, সেই আইনকে তারা ব্যবহার করছে “নাগরিক দায়িত্ব” দেখাতে আর একই সাথে সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১, ৩২, ৩৯, সমতা, মর্যাদা, জীবন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এসব ধারাকে এক ঝটকায় ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে।
 
আমি নিজে একজন উভকামী নারী, নাস্তিক, নারীবাদী। আমার নিজের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা কেমন ছিল মনে আছে, ক্লাসের মধ্যে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে, সম্পর্ক নিয়ে কথা বললে, জেন্ডার সেক্সুয়ালিটি নিয়ে বিন্দুমাত্র critical কিছু বললে একদল সহপাঠী খুব অস্বস্তি বোধ করত, কারও কারও চোখে ঘৃণা দেখা যেত। কিন্তু তখনও মনে হয়েছিল, অন্তত তর্ক করার, কথা বলার, ভিন্ন মত শুনার একটা পরিসর আছে। হোচেমিনের ঘটনায় যা দেখলাম, সেখানে তো তর্ক আলোচনার ন্যূনতম স্পেসই খুলে দেওয়া হল না শুরুতেই বলা হল, “তুমি আসতে পারবে না, কারণ তোমার অস্তিত্বই আমাদের জন্য অপরাধ।” বিশ্ববিদ্যালয়, যা হওয়ার কথা ছিল পার্থক্যের ভেতর সহাবস্থানের, সেটাই হয়ে উঠল exclusion এর সবচেয়ে সুশীল যন্ত্র।
 
এই “ট্রান্সফোবিয়া”কে যদি শুধু ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ফল বলতাম, তাহলে অর্ধেক সত্য বলা হত। বাকি অর্ধেক সত্য হল, সিসজেন্ডার হেটারোনর্মেটিভ সংস্কৃতির নিজেদের ভয়, নিজেদের নারী পুরুষ, বিয়ে সন্তান পরিবার ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, সেটা মোকাবিলা করার নৈতিক সাহস নেই অনেকের। তাই তারা “নারীর অধিকার”, “মেয়েদের সুরক্ষা”, “ফেমিনিজম” এর শব্দও ট্রান্স অন্তর্ভুক্ত হতে দিতে চায় না। হোচেমিনের সেশনটা ছিল “উইমেন’স ক্যারিয়ার কার্নিভাল” এর অংশ, মানে, কাজ, ক্যারিয়ার, workplace inclusion নিয়ে আলোচনা। সেখানে একদল শিক্ষার্থী, যারা নিজেরাই privileged, হয়তো কর্পোরেট জব, বিদেশি মাস্টার্সের স্বপ্ন দেখে, তারা ঘোষণা দিল, “এটা আমাদের নারী অধিকার এর বিরুদ্ধে, আমরা ট্রান্স এজেন্ডা মানব না।” এই cisterhood, যারা শুধু সিসজেন্ডার নারীর অভিজ্ঞতাকে “আসল নারী অভিজ্ঞতা” বলে ধরে নেয়, তারা যখন ট্রান্স নারীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তখন নারীবাদেরই একটা হিংস্র, একচেটিয়া মুখ দেখা যায়।
 
নর্থ সাউথের কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এই কপটতার সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। প্রথমে তারা বলেছিল, “আপনাকে আমরা নিরাপত্তা দেব,” তারপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মত বদলে জানাল, নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না, তাই সেশন ক্যানসেল। মানে, যারা হুমকি দিচ্ছে, যারা “ট্রান্স ফ্রি এনএসইউ” প্ল্যাকার্ড তুলছে, যারা পরীক্ষা বয়কটের নামে সন্ত্রাসের হুমকি দিচ্ছে, তাদের ঠেকানোর কর্তৃত্ব, শক্তি, ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই আছে কেবল একজন প্রান্তিক বক্তাকে বাতিল করার ক্ষমতা। এরপর আবার প্রেস রিলিজে দায় এড়ানোর ক্লিশে, ভিসি বিদেশে ছিলেন, আমরা কিছু জানতাম না, সিদ্ধান্ত নাকি অন্যরা নিয়েছে, এসব পড়ে বোঝা যায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ড কেবল শিক্ষাবাজারে ব্র্যান্ডিং করার সময় সোজা থাকে।
 
এই সব দেখে ট্রান্স, কুইয়ার, প্রান্তিক মানুষদের জন্য বার্তাটা খুব স্পষ্ট, এ দেশে তুমি যতই যোগ্য হও, যতই পেশাদার হও, যতই “সফল” হও, তবুও শ্রেণিকক্ষ, সেমিনার হল, ক্যারিয়ার ফেয়ার, টকশো, সব জায়গায় তোমার জায়গা শর্তসাপেক্ষ সংখ্যাগুরু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আরাম নষ্ট হয়ে গেলে, তোমাকে বের করে দেওয়া হবে। হোচেমিন টিভি শোতে বসে বলেছেন, “আমি এই দেশেরই মেয়ে, এই মাটিতেই জন্মেছি, তবু কেন আমাকে শুধু জেন্ডার আইডেন্টিটির জন্য এভাবে সহ্য করতে হয়?”, এটা কেবল তাঁর প্রশ্ন না, এটা আমাদের সবার, যারা cis না, straight না, obedient না, ঈমানদার না, আজ্ঞাবহ না।
 
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের “শিক্ষিত সমাজ” আসলে কতটা শিক্ষিত, এই প্রশ্ন করা জরুরি। যারা উচ্চশিক্ষার নামে গর্ব করে, বিদেশি র‌্যাঙ্কিং নিয়ে গর্ব করে, তারা যদি এক ট্রান্স বক্তার কথাও শুনতে না চায়, যদি শুনার আগেই মুখ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ওই ডিগ্রিগুলো কিসের? কেবল কর্পোরেট চেইনে ঢোকার সনদ? মানবিকতার, যুক্তির, ভিন্নতার সহনক্ষমতার কোনো চিহ্ন যদি না থাকে, তাহলে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, এলিট স্কুল কলেজ, সবই আসলে এক ধরনের কারখানা, যেখানে বানানো হয় ভালো বেতনওয়ালা অশিক্ষিত মানুষ।
 
এই মুহূর্তে, আমাদের যারা নারীবাদ, মানবাধিকার, কুইয়ার অধিকার নিয়ে কথা বলি, তাদের দায় হল এই ঘটনাকে “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ইস্যু” বলে পাশ কাটিয়ে না যাওয়া। কারণ আজ নর্থ সাউথ, কাল অন্য কোনো ক্যাম্পাস আজ হোচেমিন, কাল অন্য কেউ। ট্রান্সফোবিয়ার এই আগ্রাসনকে একাডেমিক স্পেসের ভেতর থামাতে না পারলে, খুব শিগগিরই দেখা যাবে, কুইয়ার ট্রান্স তো দূরের কথা, যে কোনো ভিন্ন মত, ভিন্ন জীবনধারা, ভিন্ন শরীরের মানুষই ওই গেটের সামনে এসে থেমে যাবে।
 
বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয় হয়, তাহলে তার প্রথম কাজ হবে প্রান্তের কণ্ঠ খুলে দেওয়া, সংখ্যাগুরু কণ্ঠের আরাম ভেঙে দেওয়া। হোচেমিনের মতো একজন ট্রান্স নারীর প্রবেশ নিষেধের ঘটনাকে স্বাভাবিক ধরে নিলে, আমরা আসলে নিজেরাই আমাদের ভবিষ্যৎকে সংকীর্ণ, হিংস্র, ভীতু এক সমাজে ঠেলে দিচ্ছি। যে সমাজে “শিক্ষিত” মানে শুধু ইংরেজি জানা, স্টার্ট আপের ভাষা জানা, কিন্তু মানবিকতার সবচেয়ে সাধারণ পাঠটাও না শেখা, মানুষ ভিন্ন হতে পারে, আর সেই ভিন্নতাকে সম্মান করা যায়।