আজ ১২ই ফেব্রুয়ারি, ডারউইন দিবস।

পৃথিবীতে খুব কম বৈজ্ঞানিক ধারণাই জনসাধারণের মানসপটে স্থায়ীভাবে বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব এমনি বিপ্লবী তত্ত্ব, তেমনি জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইন আর রাসেল ওয়ালেস প্রস্তাবিত বিবর্তনতত্ত্ব। এই তত্ত্বই আমাদের শিখিয়েছে যে, কোন প্রজাতিই চিরন্তন বা স্থির নয়, বরং আদিম এক কোষী প্রাণী থেকে শুরু করে এক প্রজাতি থেকে পরিবর্তিত হতে হতে আরেক প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে, আর পৃথিবীর সব প্রাণীই আসলে কোটি কোটি বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হতে হতে এখানে এসে পৌঁছেছে।

ডারউইন শুধু এ ধরনের একটি বিপ্লবাত্মক ধারণা প্রস্তাব করেই ক্ষান্ত হননি, বিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি (প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে) কিভাবে কাজ করে তার পদ্ধতিও বর্ণনা করেছেন সবিস্তারে, প্রথমবারের মত ১৮৫৯ সালে ‘প্রজাতির উদ্ভব’ বা ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’ বইয়ে। খুব অবাক হতে হয় এই ভেবে, যে সময়টাতে সৃষ্টি রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে প্রায় সকল বিজ্ঞানী আর দার্শনিকই সবে ধন নীল-মনি ওই বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়ে মুখ থুবরে পড়ে ছিলেন আর বাইবেলীয় গণনায় ভেবে নিয়েছিলেন পৃথিবীর বয়স সর্বসাকুল্যে মাত্র ৬০০০ বছর আর মানুষ হচ্ছে বিধাতার এক ‘বিশেষ সৃষ্টি’, সে সময়টাতে জন্ম নিয়েও ডারউইনের মাথা থেকে এমনি একটি যুগান্তকারী ধারণা বেরিয়ে এসেছিলো যা শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকেই তরান্বিত করেনি, সেই সাথে চাবুক হেনেছিলো আমাদের ঘারে সিন্দাবাদের ভুতের মত সওয়ার হওয়া সমস্ত ধর্মীয় সংস্কারের বুকে।

দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট বিবর্তনতত্ত্বকে ‘ইউনিভার্সাল এসিড’ বা রাজাম্ল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইউনিভার্সাল এসিড যেমন তার বিধ্বংসী ক্ষমতায় সকল পদার্থকে পুড়িয়ে-গলিয়ে ছারখার করে দিতে পারে, তেমনি ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্ব সমস্ত প্রথাগত ধর্মীয় ধ্যান ধারণা আর কুসংস্কারকে একেবারে দুর করে দিতে পারে। ‘ডারউইনের বুলডগ’ বলে কথিত বিজ্ঞানী টি এইচ হাক্সলি ডারউইনের ‘প্রজাতির উদ্ভব’ বইটিকে নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়ার’ পর জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘মহাস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন; আবার সেই সাথে আবার দুঃখও করেছিলেন এই ভেবে – ‘এতোই নির্বোধ আমি যে এত সহজ ব্যাপারটা আগে আমার মাথায় আসেনি।’ বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার বলেছেন, ‘ডারউইনিয় বিপ্লব যে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণা – এটি যে কারো পক্ষে খণ্ডন করা কঠিনই হবে।’ জীববিজ্ঞানী স্টিফেন জে গুল্ড মনে করতেন তাবৎ পশ্চিমা বিশ্বের আধা ডজন বাছা বাছা তত্ত্বের মধ্যে ডারউইনের তত্ত্ব থাকবে শীর্ষস্থানে। আর অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স তো মনেই করেন যে, শুধু পৃথিবী নয় সমগ্র মহাবিশ্বে কোথাও প্রাণের বিকাশ ঘটলে তা হয়ত ডারউইনীয় পদ্ধতিতেই ঘটবে, কারণ ডারউইনীয় বিবর্তন সম্ভবতঃ একটি ‘সার্বজনীন সত্য’।

সমগ্র মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে ‘সার্বজনীন সত্য’ কিনা তা এখনো প্রমাণিত না হলেও স্বীকার করে নিতেই হবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব আর এর নান্দনিক বিকাশকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের চেয়ে ভাল কোন তত্ত্ব এ মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এবং আধুনিক বিবর্তনবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা থিওডসিয়াস ডাবঝানস্কি বলেছেন যে, ‘ডারুইনীয় বিবর্তনের আলোকে না দেখতে পারলে জীববিজ্ঞানের কোন কিছুরই অর্থ হয় না।’ দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট এজন্যই বোধ হয় বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণাটির জন্য কাউকে পুরস্কৃত করতে বলা হয়, আমি নিউটন, আইনস্টাইনদের কথা মনে রেখেও নির্দ্বিধায় ডারউইনকেই বেছে নেব।’ কাজেই ডারউইন দিবস আমাদের জন্য ডারউইনের দীর্ঘ শশ্রুমন্ডিত মুখচ্ছবির কোন স্তব নয়, বরং তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের যথাযথ স্বীকৃতি, তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানের প্রতি নির্মোহ আর বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।*******বিবর্তন সংক্রান্ত কয়েকটি জনপ্রিয় বাংলা বই যা মেলায় পাওয়া যায়

-* বিবর্তনের পথ ধরে, বন্যা আহমেদ [অবসর]* ডারউইন একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা (সম্পাদনা অনন্ত বিজয়) [অবসর]* জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ, ফ্রান্সিসকো জে আয়লা (ভাষান্তর অনন্ত বিজয় দাশ, সিদ্ধার্থ ধর) [চৈতন্য] * বিবর্তনের পথে ইতিহাসের বাঁকে, আসিফ [তাম্রলিপি]* জৈববিবর্তনবাদ: দেড়শ বছরের দ্বন্দ্ব বিরোধ মনিরুল ইসলাম(সংহতি)* কেমন করে মানুষ এলো খন্দকার মাহমুদুল হাসান [কথা প্রকাশ]* মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে অভিজিৎ রায় এবং ফরিদ আহমেদ [অবসর]* ডারউইন : বিগল যাত্রীর ভ্রমণকথা দ্বিজেন শর্মা [ সাহিত্য প্রকাশ]* চার্লস ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি দ্বিজেন শর্মা [ সাহিত্য প্রকাশ]এছাড়া অন্যান্য-* ডারউইন থেকে ডিএনএ, নারায়ন সেন (আনন্দ)* বিবর্তনবিদ্যা, ড ম আখতারুজ্জামান (বাংলা একাডেমী)* প্রজাতির উৎপত্তি, ড ম আখতারুজ্জামান (বাংলা একাডেমী)* প্রাণের রহস্য সন্ধানে বিজ্ঞান, অপরাজিত বসু (শ্রীভূমি)* জীবনের রহস্য সন্ধানে, মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ (শৈব্যা)* চার্লস ডারউইন ও বিবর্তনবাদ, সুশান্ত মজুমদার (শৈব্যা)* কোষ বংশবিদ্যা, ড ম আখতারুজ্জামান (হাসান বুক হাউজ)