৫ আগস্টের উন্মাদ আনন্দের ঢেউ থামার আগেই ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এক গলিতে আগুনের লেলিহান শিখা আমাদেরকে অন্য এক বাস্তবতায় টেনে নিয়ে গেল। জলর গানের ফ্রন্টম্যান, জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়ি ভাঙচুর করে, লুটপাট করে, শেষে আগুন ধরিয়ে দিল একদল উন্মত্ত লোক। এই বাড়িটা শুধু একটা বাসা ছিল না এটা ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আশ্রম, প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো কাঠের ইটের এই বাড়িতে তিনি ৩ হাজারের বেশি নিজ হাতে বানানো বাদ্যযন্ত্র, সংগ্রহ করা লোকজ সামগ্রী, গানের আর্কাইভ, কনসার্টের পোস্টার, বই, নথি জমিয়ে রেখেছিলেন। হামলাকারীরা প্রথমে গেট ভেঙে ঢোকে, যা যা পায় লুট করে নিয়ে যায়, ফার্নিচার, আয়না, ইলেকট্রনিক্স, বই, বাদ্যযন্ত্র, তারপর সবকিছুতে আগুন লাগিয়ে পুরো বাড়িটাকেই খোলামেলা খোয়া খোলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। সৌভাগ্য যে রাহুল, তার স্ত্রী শুক্লা, ছেলে তোতা আর বাড়ির অন্যরা কোনোভাবে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে যান, কিন্তু তাদের জীবনভর গড়া সাংস্কৃতিক ঘরটি ছাইয়ে পরিণত হয়।
একই সময়ে সারা দেশে এমন আরো শত শত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের বাড়ি, দোকান, মন্দির, মঠ, স্কুল, এমনকি মৃত্তিকা গড়া প্রতিমা, ভাস্কর্য, ভাসমান সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানাচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে কমপক্ষে ২০০ ৩০০ বাড়ি, ডজনখানেক মন্দির, অসংখ্য দোকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছে। Human Rights Watch বলছে, শেখ হাসিনার পতনের আনন্দ উদযাপনের মধ্যেই অসংখ্য জায়গায় প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছে, বিশেষ করে যাদেরকে আওয়ামী লীগপন্থী বা “সংখ্যালঘু সমর্থক” হিসেবে দেখা হয়, তাদের ওপর একই সাথে Liberation War ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবেও অনেক ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা হয়েছে। কেউ ভাঙছে “মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক” বলে, কেউ “মূর্তি হারাম” বলে, কেউ বা সুযোগ নিয়ে কেবল পাশের হিন্দুর জমি দোকান দখল করছে।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে রাহুল আনন্দের পোড়া ঘর আমার কাছে শুধু এক শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষতি না, বরং এই বিপ্লবের ভেতর লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের মুখ। রাহুল সেই শিল্পীদের একজন, যিনি বছরের পর বছর গ্রাম বাংলার গান, নদী, মাটি, মানুষের গল্প দিয়ে শাসক বিরোধী অথচ মানবিক এক ভাষা তৈরি করেছেন তিনি নিজেই কোটাবিরোধী আন্দোলনের, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের পক্ষে সরব ছিলেন। তবু তার বাড়ি পুড়ল, তার যন্ত্র, আর্কাইভ ধ্বংস হল, এটাই দেখায়, যখন ভিড় উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন সে “কার পক্ষে ছিলে” আর “কোন পার্টির” ছিলে, এই পার্থক্য করে না সে শুধু জানে, যার বাড়িতে আগুন লাগালে নিজে কিছু লুট করতে পারবে, কিছু ঘৃণা ঝেড়ে ফেলা যাবে, তারই গায়ে পেট্রোল ঢেলে দিতে হবে।
আরও ভয়ের বিষয় হল, এই সব হামলাকে ঘিরে দুই ধরনের বর্ণনা তৈরি হয়েছে। একদিকে, ভারতের কিছু মিডিয়া আর ডানপন্থী গোষ্ঠী এগুলোকে “হিন্দু বধ”, “গণহত্যা”, “পোগ্রম” বলে দেগে দিয়ে নিজেদের ঘৃণা রাজনীতিকে পুঁজি করেছে, কখনও ভুল তথ্য, কখনও অতিরঞ্জন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ভরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরের কিছু “নতুন প্রগতিশীল” মুখ বলেছে, “রাহুলদার বাড়ি পুড়ানো তার ধর্মের কারণে নয়, এটা কেবল দুর্বৃত্তদের কাজ, এটাকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিও না”, যেন সম্পূর্ণভাবেই অস্বীকার করা যায় যে সংখ্যালঘু হওয়া, সাংস্কৃতিক প্রতীক হওয়া, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হওয়া, এসব পরিচয় একসাথে এই হামলায় ভূমিকা রেখেছে। বাস্তবতা হল, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা আর সরল চোরাবৃত্তি মিশে গেছে কিন্তু ভিকটিমের দৃষ্টিতে এই পার্থক্য খুব একটা সান্ত্বনা আনে না।
এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? যে স্বাধীনতার ডাকে লাখো তরুণ তরুণী রাস্তায় নেমেছিল, তারা কি কল্পনা করেছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরই প্রতিবেশী হিন্দুর বাড়ি জ্বলে উঠবে, তাদের প্রিয় শিল্পীর গানের ঘর ছাই হয়ে যাবে, তাদের গ্রাম মন্দিরের ঘণ্টার বদলে ধোঁয়ার গন্ধ ভাসবে? রাহুল আনন্দ পরে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, তার বাড়ি, যন্ত্র, আর্কাইভ হারিয়ে গেলেও তিনি বিশ্বাস হারাচ্ছেন না, তিনি এখনও গান গেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান একই সাথে তিনি বলেছেন, “আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের সাথে এই সহিংসতার কোনো মিল নেই।” এই কণ্ঠগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, কারণ বিপ্লব যদি সংখ্যালঘু, নারী, কুইয়ার, সংস্কৃতিবান মানুষদের বুকে ভয় ঠেকিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, তাহলে সেটা কেবল নতুন পোশাকে পুরোনো স্বৈরাচার।
অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাবাহিনী, ছাত্রনেতারা এখন বারবার বলছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবে, হামলাকারীদের বিচার করবে। Human Rights Watch, UN, বিভিন্ন সংস্থা স্পষ্টভাবে বলেছে, হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর এই প্রতিশোধমূলক হামলা “ঘৃণ্য” এবং নতুন সরকারের বৈধতা বজায় রাখতে হলে এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘ ইতিহাস জানি, তারা জানি, প্রতিবারই কিছু মামলা হবে, কয়েকটা গ্রেপ্তার হবে, তারপর ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে, যতক্ষণ না পরের সহিংসতা শুরু হয়। তাই এইবার যদি সত্যিই বদল আনতে চাই, তাহলে শুধু রাহুল আনন্দের বাড়ির ছাই ভস্ম দেখে কাঁদলেই হবে না আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, যে বিপ্লব সংখ্যালঘু ও সংস্কৃতির নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেটাকে আমরা সম্পূর্ণ বিজয় বলে মানতে পারি না।
রাহুলের পোড়া ঘর দেখে তাই আমার মনে হয়, এই স্বাধীনতা এখনও অসম্পূর্ণ। আমরা এক স্বৈরাচারকে নামিয়েছি, কিন্তু নিজেদের ভেতরের ছোট ছোট অত্যাচারী, সাম্প্রদায়িক, সুযোগসন্ধানী সত্তাকে নামাতে পারিনি। সেই কাজ না হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি বিপ্লবের পরে আরেকটি পোড়া ঘরের গল্প আমাদের লিখতেই হবে আর প্রতিবারই প্রশ্নটা ফিরে আসবে, এই স্বাধীনতা কি সত্যিই সেই স্বাধীনতা, যার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম?