২০২৪ জুড়ে হিজাব আর “শালীন পোশাক” নিয়ে যে তর্কটা চলছে তার কেন্দ্রে আসলে নারীর ইচ্ছা না বরং পুরুষের চোখ আর নিয়ন্ত্রণের বাসনা। একদিকে টেলিভিশন টকশো থেকে মাদ্রাসার মঞ্চ পর্যন্ত শোনা যায় “মেয়েরা শালীন পোশাক না পরলে ফিতনা বাড়বে” অন্যদিকে কিছু সেক্যুলার কণ্ঠ আবার ঠিক উল্টোভাবে হিজাব বা বোরকাকে “মধ্যযুগীয় কারাগার” বলে তাচ্ছিল্য করে দুই পক্ষেরই ফোকাস থাকে নারীর গায়ে কী আছে, কিন্তু নারীর নিজের কণ্ঠটা কোথাওই ঠিকভাবে শোনা যায় না। গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, হিজাব বা বোরকা অনেক নারী নিজের পছন্দে, ধর্মীয় আস্থায় বা নিরাপত্তার অনুভূতি থেকে পরে ঠিকই, কিন্তু যেভাবে রাষ্ট্র, পরিবার আর উগ্র গোষ্ঠীগুলো মিলেমিশে পোশাককে ইজ্জত আর ধর্মের প্রতীকে পরিণত করেছে তাতে শেষ পর্যন্ত নারীর গায়ে কাপড় কতটা আছে তা দিয়ে তার চরিত্র, বিশ্বাস আর নাগরিকতার মান নির্ধারণ করা হয়।
জুলাই বিপ্লবের পর থেকে “তওহিদি জনতা” নামের বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে যে নৈতিক পাহারাদারি বেড়েছে, তা খুব স্পষ্ট করে দেখিয়েছে এই শালীনতার ছুরি আসলে কার গলায় বসে। কক্সবাজারে সৈকতে হাঁটা কয়েকজন তরুণীকে “অশালীন পোশাক”ের দোহাই দিয়ে রাস্তায় ধরে তল্লাশি, মারধর আর বসে ওঠা বসার শাস্তি দেওয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী কর্মী বা শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে হেনস্তা, ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে চরিত্রহনন আর উত্তরের বিভিন্ন জেলায় হিজাব বা বোরকা না পরায় মেয়েদের স্কুল কলেজে যাওয়া বন্ধ করতে অভিভাবকের ওপর চাপ এসব ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত খবর। আবার উল্টো দিকে দেখা যায়, কোনো নারী যদি হিজাব রাখে, অনেক অফিস বা মিডিয়া জগতে তাকে “কম প্রফেশনাল” ভাবা হয়, তার মতামতকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয় অর্থাৎ ধর্মীয় আর সেক্যুলার উভয় শিবিরেই শেষ পর্যন্ত নারীর শরীরকে আদর্শ নারী বানানোর পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়, কেবল আদর্শের ভাষা আর পোশাকের কাট ছাঁটটা বদলে যায়।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে হিজাব পর্দার এই বিতর্ককে দেখি পুরুষের চোখের আধিপত্যের গল্প হিসেবে, যেখানে শালীনতা মানে সবসময় “মেয়েদের কী পরা উচিত” কখনোই “ছেলেদের কী শেখা উচিত” না। ইসলামী শিক্ষায়ও প্রথম নির্দেশটা নাকি পুরুষের দিকে চোখ নামিয়ে রাখো কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমাজে চোখ নামানো শেখানো হয় মেয়েদের ছেলেদের শেখানো হয় “ছেলেরা তো এমনই, তাই মেয়েদেরই সাবধানে থাকতে হবে।” যে পোশাক এক মেয়ের কাছে নিরাপত্তা আর ক্ষমতায়নের অনুভূতি দেয়, আরেকজনের জন্য সেটা পরিবার আর সমাজের চাপের ফলাফল এই দুই বাস্তবতাকে বোঝার বদলে যখন সারাক্ষণই “হিজাব ইজ ভালো / হিজাব ইজ খারাপ” টাইপ বাইনারিতে আটকে রাখা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় শালীনতা নিয়ে এই সব কথা শেষ পর্যন্ত নারীর স্বাধীনতা নয়, বরং তার উপর নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখারই আরেকটি ভাষা।