মৌলবাদের কাছে রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ

একটা দেশের ভবিষ্যত বদলাতে চাইলে তার পাঠ্যবইতে হাত দিলেই হয়, এটা মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো অনেক আগেই শিখে গেছে। “শরীফা’র গল্প” নিয়ে যা হল, সেটা এই সত্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস সমাজবিজ্ঞান বইয়ে থাকা দুই পাতার ছোট গল্প, একজন ট্রান্স কিশোরীর আত্মপরিচয় খোঁজা, পরিবারের অবজ্ঞা, সমাজের ঘৃণা পেরিয়ে হিজড়া কমিউনিটিতে আশ্রয় পাওয়া, এইটুকু মানবিক বর্ণনাই বাংলাদেশের ধর্মব্যবসায়ী আর তাদের বরাবরের সহযোগী রাষ্ট্রের কাছে সহ্য হলো না। জানুয়ারিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মাহতাব প্রকাশ্যে সেই পাতা ছিঁড়ে ফেলার পর, ইসলামপন্থী গোষ্ঠী, আইনি নোটিশ, টকশো, ওয়াজ খুতবা, সব মিলিয়ে পাঁচ মাস ধরে এমন এক ঘৃণার ক্যাম্পেইন চলল যে, জুনে এসে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নীরবে গল্পটা বই থেকে সরিয়ে দিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বললেন, কিছু আপত্তি এসেছে, তাই আপাতত গল্পটা বাদ দেওয়া হয়েছে পরে “উপযুক্ত উপায়ে” এই বিষয়টা পড়ানোর চিন্তা নাকি থাকবে। অথচ সবাই জানে, একবার বাদ পড়া বিষয় কত কমই আর ফিরে আসে।
 
এই পুরো প্রক্রিয়াটা দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে একটা রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের ঘোষিত আদর্শের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে। সংবিধানে লেখা আছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও সবার সমান ধর্মীয় স্বাধীনতা, বৈষম্যহীনতা, মানবিক মর্যাদা থাকবে ২০১৪ সালে সরকার হিজড়া দের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ২০২০ সালে আলাদা ভোটার ক্যাটাগরি খুলেছে, এসব দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে inclusive, প্রগতিশীল হিসেবে ব্র্যান্ড করতে চেয়েছে। কিন্তু শিক্ষাবোর্ডের এক কর্মচারীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল আসল কথাটা, “কিছু আপত্তি এসেছে, তাই গল্পটা বাদ।” আপত্তি কার? হেফাজত ঘেঁষা ওলামা বোর্ড, অনলাইন ট্রল আর্মি, ব্র্যাক শিক্ষক আসিফ মাহতাবের মতো ঘৃণাবাদী “ইন্টেলেকচুয়াল”, আর সেইসব সংগঠন যারা মনে করে সপ্তম শ্রেণির বাচ্চারা যদি ট্রান্স কিশোরীর গল্প পড়ে, তারা নাকি হঠাৎ “ট্রান্সজেন্ডার হয়ে যাবে”।
 
আইনজীবী কওকিছু মানুষ এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর এনসিটিবি’কে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাল, “শরীফা’র গল্প তরুণদের ট্রান্সজেন্ডারদের দিকে টেনে নিচ্ছে, subtely inspire করছে”, এমন আজব ভাষা ব্যবহার করে বলল, ৩০ দিনের মধ্যে বই তুলে না নিলে হাইকোর্টে রিট করবে। একই সময়ে কিছু “ইসলামিক” পেজে আর ওয়েবসাইটে আর্টিকেল বেরোল, এটা নাকি সোরস মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার পশ্চিমা চক্রান্ত, সোরস ফান্ডিংয়ে “ট্রান্সজেন্ডারিজম” ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের পাঠ্যবইয়ে, যাতে শিশুদের মন বাইসেক্সুয়াল সমকামীতার জন্য প্রস্তুত করা যায়।
 
অন্যদিকে মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশ, জাস্টিসমেকারস বাংলাদেশ, এলজিবিটিকিউআই সংগঠনসহ বহু নাগরিক, লেখক, শিক্ষক, নারী অধিকারকর্মী এই সুপারিশের বিরুদ্ধে সরব হলো। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলল, গল্পে কিছু factual ভুল থাকলে সেগুলো সংশোধন করো, গবেষণা ভিত্তিক, ট্রান্স কমিউনিটির সাথে পরামর্শ করে নতুন করে লিখো কিন্তু সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দেওয়া মানে মৌলবাদী চাপের কাছে নত হওয়া, আর টেক্সটবুক থেকে লিঙ্গ বৈচিত্র্য পুরো অদৃশ্য করে দেওয়া। দীর্ঘ বিবৃতিতে লেখা হল, এই কমিটি পক্ষপাতদুষ্ট, তাদের সুপারিশ মানে হলো extremist দের কথাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে নেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বেছে নিল পরিচিত পথ, যারা গলা জোরে চেঁচায়, তাদের কথাই সত্যি ধরা হলো যারা যুক্তি আর মানবিকতার ভাষায় কথা বলল, তাদেরকে “এনজিও দালাল” আর “সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারিগর” বানিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হলো।
 
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই ঘটনার প্রতিটা ধাপ আমার নিজের শরীরে আঘাতের মতো লেগেছে। পাঠ্যবইয়ে কাঁচি শুধু ট্রান্স কিশোরীর গল্পে পড়েনি সেটা পড়েছে আমার নিজের শৈশবেও। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের বইতে যৌনতা, সম্মতি, যৌন নির্যাতন, লিঙ্গ বৈচিত্র্য, কোনো কথাই ছিল না ফলে নিজের মধ্যে যে ভিন্নতা, যে অস্বস্তি, যে আকর্ষণ, তা কোনো ভাষায় ধরতে পারিনি। “শরীফা’র গল্প” এর মতো একটা লেখা যদি আমার বইতে থাকত, হয়তো একটু আগেই বুঝতাম যে আমি একা নই, যে আমার মতো আরেকজন আছে, সে ট্রান্স, আমি bi, কিন্তু আমরা দুজনেই পুরুষতান্ত্রিক, হেটেরোনর্মেটিভ সমাজের চোখে “problem”। সেই সম্ভাবনাটাকে আজকের প্রজন্মের হাত থেকে রাষ্ট্র নিজে কেড়ে নিচ্ছে, এটা কি কেবল ইসলামিস্ট চাপের ফল, নাকি নিজস্ব ভীরুতারও বহিঃপ্রকাশ?
 
এই আত্মসমর্পণের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও উপেক্ষা করা যায় না। ২০২৩ ২৪ নির্বাচনী সংকটে আওয়ামী লীগের প্রতি ঘৃণা জমে থাকা বহু মানুষ “নতুন বাংলাদেশ”, “ধর্মনিরপেক্ষ পরিবর্তন”, “সামাজিক ন্যায়বিচার” এর স্বপ্নে নতুন শক্তির দিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু প্রথম বড় টেস্ট কেসেই দেখা গেল, পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে সেই নতুন শাসকরাও যতটা না মানবিকতা বন্ধু, তার চেয়ে বেশি “রাস্তায় থাকা গোষ্ঠী” বন্ধু। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ পর্যন্ত পরে বলল, টেক্সটবুক কমিটি বাতিল, ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপে সিদ্ধান্ত বদল, এসব মিলিয়ে সরকার মৌলবাদের কাছে ছাড় দিচ্ছে, যা “নতুন বাংলাদেশ” এর মূল চেতনার বিরোধী।
 
পাঠ্যবইয়ে কাঁচি চালানো সহজ, কিন্তু সেই কাঁচির দাগ খুব গভীর। আজ যে ট্রান্স কিশোরী সপ্তম শ্রেণির বই খুলে নিজের মতো কারও গল্প না পেয়ে আবার একা অনুভব করল, কাল সে বড় হয়ে হয়তো আত্ম ঘৃণায় নিজের শরীর কেটে ফেলবে, বা এমন এক বিয়ের মধ্যে বন্দি হবে, যেখানে সে নিজেকে প্রতিদিন ধর্ষিত মনে করবে। আজ যে সহপাঠীরা বইতে তার গল্প পড়ে না, কাল তারা তাকে দেখে আরও সহজে “হিজড়া”, “ওরা মানুষ না”, এই সব গালি দেবে। আর আমরা, যারা মনে করেছিলাম, অন্তত পাঠ্যবই এর মধ্যে একটু আশা আছে, তারা আরও একবার বুঝব, রাষ্ট্র আমাদের গল্পের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে মৌলবাদীদের সাথে বোঝাপড়া করাকেই নিরাপদ মনে করে।
 
এই আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে কথা বলা তাই শুধু “একটা গল্প ফিরিয়ে আনা” র প্রশ্ন না এটা ভবিষ্যতের পাঠ্যবই, স্কুল, ক্যাম্পাস, আইনের প্রশ্ন। যদি আজ শরীফা’র গল্প সহজে মুছে ফেলা যায়, কাল কিশোরীর প্রেম কাহিনি, বাল্যবিয়ে বিরোধী অধ্যায়, যৌন সম্মতি শেখানোর অংশ, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে থাকা প্রগতিশীল অধ্যায়গুলোও কেটে ফেলা যাবে সুন্দর করে। ২০১৩ ১৪ তে আমরা দেখেছি, কিভাবে বিবর্তন তত্ত্ব, নারীবাদী লেখা, non Arab মুসলিম সংস্কৃতি, এসব বই থেকে বাদ দিতে পারে প্রেশার গ্রুপ। আজ শরীফা, কাল অন্য কেউ।
 
তাই, পাঠ্যবইয়ের এই কাঁচির আওয়াজ শুনে যদি আমাদের কিছু করার থাকে, সেটা হলো স্মৃতিতে, লেখায়, অনলাইনে, আড্ডায়, সব জায়গায় এই গল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা। শরীফা নামটা হয়তো সরকারি বইতে থাকবে না কিন্তু আমাদের পাঠে, আমাদের ক্লাসে, আমাদের ব্লগে, আমাদের সন্তানদের সাথে কথোপকথনে সে যেন থেকে যায়, একটা মানুষ হিসেবে, যে নিজের পরিচয়ের পথে হাঁটতে গিয়ে আমাদের রাষ্ট্র সমাজের প্রকৃত চেহারাটা উল্টে ধরেছে। যে দিন রাষ্ট্র আবার সাহস পাবে, যে দিন সত্যিকার অর্থে মৌলবাদের সামনে না ঝুঁকে দাঁড়াতে পারবে, সেদিন হয়তো শরীফা আবার ফিরবে বইয়ের পাতায়। তার আগ পর্যন্ত সে থাকবে এই লেখায়, তোমার স্ক্রিনে, আর আমার মত আরও বহু “হারাম” জীবনের ভিতরের গভীর গোপন আলোকরেখায়।

Exit mobile version