ভাষার মাসে বোবা করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র

ক্ষমতাসীনদের বহুবছরের ক্ষমতার বদমায়েশি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সরাসরি গায়ে হাত না দিয়ে আইনের ক্লজ খুলে তাকে অপরাধী বানানো যায়। পুলিশের হাতে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, ভয়াবহ জেল-জরিমানা, এসব শুধু কাগজে লেখা শব্দ না, এগুলো এমন এক চাপ, যা মানুষকে নিজেই চুপ করে যেতে শেখায়। “এটা লিখলে কেস খাওয়া লাগতে পারে”, এই ভয়টা মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়াই আসল লক্ষ্য।
 
মাঝে মাঝে মনে হয়, এই দেশটা যেন ব্লগারদের নিয়ে এক ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলেছিল। প্রথমে ছিল আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, যার ভয়াবহতা থেকে বাঁচার আশ্বাস দিয়ে সরকার বলল, নতুন আইন আসছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর এলো ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, আরও বেশি ক্ষমতাধর, আরও বেশি অমানবিক। যারা ২০১৫ সালের ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সময় ব্লগে লিখতাম, আমাদের অনেকে ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেলাম কেউ বিদেশে পালাল, কেউ নাম বদলাল, কেউ একেবারে লেখাই ছেড়ে দিল। একদিকে কুপিয়ে মেরে ফেলার বাস্তব হুমকি, অন্যদিকে জেলে ভরে রাখার আইন, এই দুইয়ের মাঝে আটকে থাকা মানুষ কি করে শুধু ‘মাতৃভাষা দিবসের গর্ব’ নিয়ে বছর কাটাবে?
 
আমি যখন লন্ডনের শীতে মোড়ানো একদিন ভোরে ফোনে খবর পড়ি, বাংলাদেশে অমুক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আবার ডিজিটাল সিকিউরিটি মামলার খবর, বা তমুক লেখককে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” এর অভিযোগে টেনে নেওয়া হয়েছে থানায়, তখন এক ধরনের অপরাধবোধে ভেঙে পড়ি। আমার ভাষা, আমার মাটি, আমার শহিদ মিনার, সবকিছু থেকে এত দূরে দাঁড়িয়ে কিছুটা নিরাপদ, আর ওদিকে যারা এই মাটিতে থেকেও নিজের মাতৃভাষায় সত্যটা বলতে পারছে না, তারা আইনের গিঁটে আটকে আছে। এমন এক বোবা করার ষড়যন্ত্র, যা শব্দের ওপর নয়, পুরো এক প্রজন্মের মগজের ওপর চালানো হচ্ছে।
 
আমরা যে দেশটার জন্মকথা বলি, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ আর ভাষা আন্দোলনের গৌরব কেবল ইতিহাস বইয়ের পাঠ্যাংশ হয়ে আছে, বাস্তব জীবনে সে গৌরবকে প্রতিদিন বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে মন্ত্রীরা শহিদ মিনারে ফুল দেবে, বিকেলে হয়তো একই মন্ত্রণালয়ের ফাইলে সই পড়বে আরেকটা সমালোচনামূলক রিপোর্টের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলায় অনুমোদন দিতে। আমাদের পাঠ্যবই শেখায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, আর বাস্তবতা শেখায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, যতক্ষণ তা ক্ষমতাসীনদের আরাম নষ্ট না করে।
 
নারী হিসেবে এই সেন্সরশিপকে আরও ভেতর থেকে টের পাই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ সবসময়ই চেয়েছে নারীর গলায় লাগাম পরাতে, কী পোশাক পরবে, কাকে ভালোবাসবে, কোথায় যাবে, কত জোরে কথা বলবে। এখন সেই লাগামের নতুন নাম ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। তুমি যদি নারী হয়ে অনলাইনে ধর্ষণ, নির্যাতন, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় লিখো, তোমার কথাকে খুব সহজেই “অশ্লীল”, “পরিবারের মূল্যবোধবিরোধী”, “সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টকারী” হিসেবে দেখানো যায়। যারা রাস্তায় আমাদের গায়ে হাত দেয়, তারা যতটা না ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় যে আমরা মুখ খুলে তাদের নাম বলব। আর সেই মুখ বন্ধ করার ‘সভ্য’ পদ্ধতি হয়ে ওঠে সেন্সর আইন।
 
যখন অনলাইনে সমকামী, উভকামী বা ট্রান্স মানুষদের কথা বলি, দেখি কত দ্রুত সেই লেখা “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” এর ঝুড়িতে ফেলা যায়। হ্যাঁ, এই একই ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ যার নামে আদর্শের বই নিষিদ্ধ হয়, যার নামে লেখককে দেশছাড়া হতে হয়, যার নামে কার্টুন আঁকা অপরাধ হয়। রাষ্ট্র আর মৌলবাদ হাত মিলিয়ে মিলে বানিয়েছে এমন এক তর্কহীন বর্ম, যার ভেতরে তারা লুকিয়ে রাখে নিজেদের ভয়, নিজেদের অপরাধ, নিজেদের দুর্বলতা।
 
একুশের ভাষা আন্দোলন যদি কিছু আমাদের শিখিয়ে থাকে, সেটা এই, ভাষা কারও একার সম্পত্তি নয়, ভাষা কখনও কেবল ফুল আর গান দিয়ে বেঁচে থাকে না। ভাষাকে বাঁচাতে হলে তাকে সত্য বলার, প্রশ্ন করার, প্রতিবাদ করার অধিকার দিতে হয়। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে ভাষাকে কেবল শোকের স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়ে রাখা হচ্ছে তার ধারালো প্রান্তগুলো ভেঙে ফেলে রাখা হচ্ছে সরকারি অনুষ্ঠানের ভাষণ আর স্কুলের রচনা পরীক্ষার ভেতর।
 
আমি চাই, আমরা অন্তত নিজেদের সাথে সৎ হই। যদি সত্যিই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তবে বুক ফুলিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ভাষার জন্য জীবনদান’ এসব কথা বলার ভণ্ডামি বন্ধ করি। যদি সত্যিই আমরা বিশ্বাস করি ভাষা মানুষের মৌলিক অধিকার, তাহলে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, যেগুলোকে এখন নানা নামে নতুন করে প্যাকেজিং করা হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের ভয় ঠিক একই আছে।
 
একুশের শহিদ মিনারে দাঁড়িয়ে যে শপথ নেয়া হয়, তা যেন কেবল ফুলের পাপড়ি আর সাদা পোশাকে সীমাবদ্ধ না থাকে। শপথটা হোক এই, কেউ যখন সত্য বলার জন্য গ্রেপ্তার হবে, লেখার জন্য কেস খাবে, ধর্মের প্রশ্ন তোলার জন্য হুমকি পাবে, তখন আমরা অন্তত চুপ করে থাকব না। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু গান গাওয়া নয়, মানে সেই ভাষায় উচ্চারিত অস্বস্তিকর, অপ্রিয়, তবুও প্রয়োজনীয় সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা। ভাষার মাসে যারা আমাদের বোবা করে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে গলা খুলে বলা, এইটাই একুশের সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে কঠিন পালন।

Exit mobile version