ধর্মকে আমরা অনেক সময় নৈতিকতা, পবিত্রতা ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাস জুড়ে ধর্ম বহুবার নিপীড়নের হাতিয়ার হয়েছে। ধর্মের নামে যুদ্ধ হয়েছে, নারীকে দমন করা হয়েছে, ভিন্ন মতকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাই ধর্মের সমালোচনা প্রয়োজন । কারণ সমালোচনা ছাড়া আমরা কখনোই বুঝতে পারব না ধর্ম কীভাবে মানবাধিকারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আমি একজন নারী, আমি একজন বাইসেক্সুয়াল, এবং আমি একজন নারীবাদী। আমার পরিচয় আমাকে শিখিয়েছে এই সমাজে ভিন্ন যৌনতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানে প্রতিদিন সমাজের চোখে অপরাধী হওয়া। ধর্মের প্রভাব এত গভীর যে মানুষ মনে করে সমকামিতা কোনো “পাপ”। অথচ ভালোবাসা কখনোই অপরাধ হতে পারে না। কিন্তু ধর্মের ব্যাখ্যা আমাদের ভালোবাসাকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রায় সব ধর্মেই সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাইবেলে সোডম শহরের গল্প, কোরআনে লুতের জাতির কাহিনী, হিন্দু ধর্মে ধর্মবিরুদ্ধ সম্পর্কের ব্যাখ্যা সবই সমকামীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে। এই ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলো সমাজে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে মানুষ মনে করে সমকামিতা কোনো অস্বাভাবিকতা। অথচ বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, সমকামিতা মানুষের স্বাভাবিক যৌন প্রবণতার একটি অংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও ভয়াবহ। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সমলিঙ্গের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মূলত ঔপনিবেশিক যুগের ধর্মীয় ও নৈতিক ধারণা থেকে এসেছে। ধর্মীয় নেতারা এখনো সমকামীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান, তাদের “অশ্লীল” বা “অমানবিক” বলে আখ্যা দেন। এর ফলে পরিবার থেকে বহিষ্কার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, জনসমাজে সহিংসতা সবকিছুই সমকামীদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালে ঢাকায় সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশের সমকামী সম্প্রদায় আরও বেশি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। আমি যখন এই খবর পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল আমাদের সমাজে ভালোবাসার জন্য জীবন দিতে হয়। ধর্মের নামে এই সহিংসতা আমাদের মানবিকতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
ধর্মের সমালোচনা তাই অপরিহার্য। এটি আমাদের শেখায় যে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও ভালোবাসা কোনো ধর্মের দয়া নয়, বরং মানুষের জন্মগত অধিকার। নারীবাদী ও মানবতাবাদী দৃষ্টিতে ধর্মের সমালোচনা হলো মুক্তির পথ-যেখানে ভালোবাসা অপরাধ নয়,বরং মানবিকতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।
সকল ধর্ম সমকামীদের নিগৃহীত করেছে কারণ ধর্মের মূল কাঠামোই পুরুষতান্ত্রিক। ধর্ম নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে, যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করে আর ভিন্ন যৌনতা ও পরিচয়কে অস্বীকার করে। ধর্মের চোখে সমকামী মানে নিয়ম ভঙ্গকারী, তাই তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু আমি বলি কোনো বিশ্বাসই মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় নয়।
অগণতান্ত্রিক এবং অসহিষ্ণু সমাজে, গঠনমূলক সমালোচনাকে অপমান হিসেবেও প্রচার করা হয়। এর পেছনে একটি স্পষ্ট বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে। উদ্দেশ্য হল ভিন্ন মত পোষণকারীদের বিতাড়িত করা। এর জন্য, মানুষের মনে এক বিশেষ ধরণের আবেগগত অনুভূতি তৈরি করা হয়। চিন্তাহীন মানুষকে সম্মোহিত করে, গঠনমূলক সমালোচনাকে বিশেষ আবেগগত অনুভূতির উপর আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এবং এই আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায়, বিভিন্ন মতামতের মানুষের উপর ছুড়ে মারা হয়। বিভক্তি তৈরি করা হয়। এই বিভাজনের উদ্দেশ্য হল মানুষ যাতে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হয়। তারা যুগ যুগ ধরে শোষিত, নিপীড়িত এবং বঞ্চিত। কিন্তু আসল শত্রু জানে না শোষক কারা।
দার্শনিকভাবে, বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব সর্বদা বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দুদের মূর্তি পূজা মুসলমানদের কাছে হাস্যকর। আবার, মুসলমানদের গরু বলি হিন্দুদের কাছে অপমানজনক। যখন একজন ইসলামপন্থী তার ধর্মীয় দর্শন প্রচার করেন, তখন তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন যে তার বিশ্বাস অনুসারে তার ধর্মই সেরা। এর জন্য, তাকে অন্যান্য ধর্মের অযৌক্তিকতা এবং অযৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে। এই ক্ষেত্রে, যদি তিনি বলেন যে প্রাণহীন মূর্তি পূজা করা একেবারেই অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। এটি একটি মিথ্যা মতবাদ। তাহলে একটি দার্শনিক দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হবে। এটি কি সমালোচনা নাকি অপমান বলা হবে? তাকে এটাও বলতে হবে যে ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্মই মিথ্যা। তার মতামত প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তাকে এটি বলতে হবে। তাহলে কি এটি ধর্মের অপমান হবে না?
একইভাবে, যদি একজন খ্রিস্টান পুরোহিত তার নিজস্ব যুক্তি দিয়ে দেখান যে ইসলামের নবী মিথ্যা এবং খ্রিস্টধর্মের নবীই একমাত্র সত্য, তাহলে কি এটি ইসলামের নবীকে অপমান করা হবে না? তবুও তাকে তার ধর্ম প্রচারের স্বার্থে কথা বলতে হবে। এর জন্য কি সেই পুরোহিতকে শাস্তি দেওয়া উচিত?
যদি একজন নাস্তিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি দেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ নেই, তাই ধর্মগুলি মানুষের সৃষ্টি। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নবীর কাছে বার্তা এসেছে, তাহলে তা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। অতএব, ইসলামের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর জন্য ধর্মকে অপমান করার জন্য আমাদের কি শাস্তি দেওয়া উচিত? তবুও নাস্তিকতা এই ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত।
আমরা যদি সত্যিই ন্যায়বিচার চাই, তবে আমাদের সাহস করে বলতে হবে, ধর্মের নামে নিপীড়ন নয়, মানবতার নামে স্বাধীনতা চাই। সমকামীদের মুক্তি আসবে তখনই, যখন আমরা ধর্মকে প্রশ্ন করব, সমালোচনা করব, এবং ভালোবাসাকে অপরাধ নয় বরং অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেব।