ব্লগার নিউজ

‘হিটলিস্ট’-এর ৮৪ ব্লগারের মধ্যে ৮ জনকে হত্যা

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগে তৈরি হয় গণজাগরণ মঞ্চের । ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগাররাসহ নতুন প্রজšে§র তরুণরা কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ রায়ের দাবিতে আন্দোলনের গণজোয়ার গড়ে তুলেছিল । সে সময় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সর্বপ্রথম আনসার উল্লাহ বাংলা টীম নামে একটি সংগঠন ‘হিটলিস্ট’ নামে ৮৪ জন ব্লগারসহ আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রকাশ করেছিল। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উক্ত হিটলিস্ট নিয়ে সংবাদ ছাপা হয় । তালিকায় নাম প্রকাশের বিষয়ে বলা হয়েছিল ‘এরা সবাই ইসলামের দুশমন।’ ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের নাস্তিক উপাধি দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, এরা ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর নামে কটূক্তি করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে । তালিকা অনুযায়ী একে একে ব্লগারদের হত্যা করা হবে বলে সে সময় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হুমকি প্রদান করা হয় ।

হুমকি অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা সে সময় নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে খুব বেশি সর্তক না থাকায় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আততায়ীদের হাতে খুন হয়ে যায় ৭ জন ব্লগার। সরকারের তরফ থেকেও ব্লগারদের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে । ৮৪ জনের তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা ইমরান এইচ সরকার, আসিফ মহিউদ্দিন, অভিজিৎ রায়, রাজিব হায়দার, শোভন, মারুফ রসুল, আরিফ জেবতিক, ইব্রাহীম খলিল, আরিফুর রহমান, অনন্য আজাদ, মাহামুদুল হক মুন্সি বাধনের নাম শীর্ষে ছিল । শীর্ষ ১০ তালিকার মধ্যে

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজিব হায়দার শোভন এবং গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয় । ৮৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০১৩ সালে সর্ব প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারি জাফর মুন্সি, ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিকুল ইসলাম শান্ত, ২৮ ফেব্রুয়ারি মামুন হোসেন এবং ২ মার্চ জগৎ জ্যোতী তালুকদারকে হত্যা করা হয়। এছাড়া সে বছরই বিভিন্ন সময়ে আরিফ হোসেন দীপ এবং জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু নামে আরো দু জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। এতে হিট লিষ্টের ৮৪ জনের মধ্যে ৮ জন ব্লগারকে হত্যা করতে সক্ষম হয় আততায়িরা।

পুলিশ, চিকিৎসক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য থেকে জানা যায় হত্যাকারীরা ব্লগারদের একই কায়দায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এছাড়া প্রায় প্রত্যেককে অন্ধকারে পেছন থেকে আক্রমণ করে হত্যার কাজ সম্পন্ন করা হয়। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তমনা এবং বিজ্ঞানসম্মত লেখক অভিজিৎ রায়কেও একই পদ্ধতিতে হত্যা করে হত্যাকারীরা । যুদ্ধাপরাধীর রায়কে কেন্দ্র করে মুক্তচিন্তার তরুণ ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের একের পর এক হুমকি প্রদান করে হত্যা করার বিষয়ে সরকার কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেছে হিট লিষ্টের শীর্ষ তালিকায় থাকা ব্লগার অনন্য আজাদ, ইব্রাহীম খলিল এবং ডা. ইমরান এইচ সরকার । সরকারের উদাসীনতায় এইসব হত্যাকারীরা প্রশ্রয় পেয়ে আরো শক্তি অর্জন করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অভিজিৎ রায়ের হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আসিফ মহিউদ্দিন সরকার এবং আইন-শৃংক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততাকেই দায়ী করেছেন ।

এ ব্যাপারে মুক্তচর্চার লেখক অনন্য আজাদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তচিন্তার লেখকদের নিরাপত্তা তো দুরের কথা এখন পর্যন্ত যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের হত্যাকারীদের বিচার আমরা পাইনি। তিনি সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন মন্তব্য করে তার পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। অনন্য আজাদ বলেন, ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালীন সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হই। সে সময় পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে নাস্তিক মালাউন বলে গালি দিয়েছিলো বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি পুলিশের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, যে পুলিশ আমাদের নাস্তিক মালাউন বলে গালি দেয় তাদের কাছে আমরা সুরক্ষা আশা করতে পারি না ।

চলমান অবস্থায় নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে ড. ইমরান এইচ সরকার বলেন, আমি ব্যাক্তিগতভাবে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবিনা।